সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২

অবৈধ প্রভাবশালী চাচা গ্রেপ্তার, খলনায়ক ভাতিজা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৮:২৬

ছবি: সংগৃহীত

লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় ক্ষমতাধর আওয়ামী লীগ নেতা ও চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা (৫৫) গ্রেপ্তার হয়েছেন। শনিবার (৩০ নভেম্বর ২০২৫) দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার এলাকার ‘মুসকান টাওয়ার’ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

 

গ্রেপ্তার নজরুল ইসলাম মোল্লা কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক, পেশায় একজন প্রধান শিক্ষক এবং তুষভান্ডার এলাকার মৃত রেফাজ মোল্লার ছেলে। তিনি সাবেক ছাত্রনেতা ও সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও পরিচিত।

 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় কালীগঞ্জ এলাকায় খুন ও সহযোগিতার অভিযোগে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহবাগ থানায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযোগকারী মৃত্যুবরণ করায় মামলাটি রেকর্ড হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে কালীগঞ্জ থানার সন্ত্রাস বিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় নজরুল ইসলাম মোল্লাকে এবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

থানা-পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন মহলের অভিযোগ অনুযায়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার হাজিরহাট এলাকায় আশ্রয় প্রকল্প-২ এর আওতায় বরাদ্দকৃত খাস জমিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে নজরুলের বিরুদ্ধে। বৈরাতী মৌজার হাজিরহাট এলাকায় ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ৫১৯২ দাগে ২২ শতক, ৫১২৮ দাগে ৫৩ শতক এবং ৫১১৯ দাগে ১১ শতক, মোট ৮৬ শতক জমিতে আশ্রয় প্রকল্প-২ এর অধীনে ২০টি ঘর নির্মাণের কথা থাকলেও সেখানে মাত্র ২টি ঘর ও একটি গণশৌচাগার নির্মাণ করে বাকি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

 

স্থানীয়দের দাবি, সরকারি আশ্রয় প্রকল্পের সেই জমিতে ক্ষমতার দাপটে মার্কেট ও দলীয় কার্যালয় নির্মাণ করেন নজরুল ইসলাম মোল্লা ও তার ভাতিজা যুবলীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মেজবা উদ্দিন বিপ্লব। এর আগেও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ায় জেলা প্রশাসন তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, ওই প্রকল্পের মাত্র দুইটি গরিব-অসহায় পরিবার সেখানে আশ্রয় পেলেও তারা এখন চরম হুমকির মধ্যে জীবনযাপন করছে।

 

অভিযোগ আছে, কালীগঞ্জের একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘প্রধান শিক্ষক’ পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে নজরুল ইসলাম মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে নানা আর্থিক অনিয়ম করে আসছেন। বাবুর আলী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন নিলামে না দিয়ে বিক্রি করে আত্মসাত, বিদ্যালয় ও সড়কের পাশে সরকারি গাছ নিয়মবহির্ভূতভাবে কেটে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনাও তদন্তে উঠে আসে বলে অভিযোগ সূত্রে জানা যায়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয় এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন উপ-পরিচালক। এরপরও ‘রহস্যজনকভাবে’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে পদে বহাল রাখেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

 

স্থানীয়দের দাবি, নজরুল ইসলাম মোল্লা ও তার ভাতিজা যুবলীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মেজবা উদ্দিন বিপ্লব রংপুর ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন স্থানে নাশকতার পরিকল্পনা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ– ইন্ডিয়া থেকে অবৈধ অস্ত্র এনে চর এলাকার কিছু ডাকাত বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে যে কোনো সময় রংপুর বিভাগে নাশকতা ও হামলার পরিকল্পনা করছে তারা।

 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট সরকারের মদদপুষ্ট বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতার জোরে কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও লালমনিরহাট-২ আসনে আওয়ামী মনোনীত প্রার্থী সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের ছত্রছায়ায় নজরুল ও তার ভাতিজা দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গা দখল করে তুষভান্ডারে ‘মুসকান টাওয়ার’ নামে দুইতলা ভবন নির্মাণ করে সেখানে হোটেল ব্যবসা চালানোরও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সাংবাদিক ও ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তি জানান, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, জমি দখল ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা সারা বছর বিভিন্ন সেক্টর থেকে অর্থ বাণিজ্য করেন। তাদের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ থানাসহ শাহবাগ থানাতেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

 

নজরুল গ্রেপ্তারের খবরে এলাকায় স্বস্তি ফিরলেও ভাতিজা যুবলীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মেজবা উদ্দিন বিপ্লবের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, “অবৈধ উপার্জনের কারিগর চাচা ধরা পড়লেও ভাতিজা খলনায়ক এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে টাকার মাধ্যমে সব সামলে নিচ্ছেন।”

 

নজরুল ইসলাম মোল্লা গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, “দীর্ঘদিনের চেষ্টা এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কুখ্যাত নজরুল ইসলাম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। সন্ত্রাসবিরোধী মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হিসেবে আজ রবিবার তাকে আদালতে পাঠানো হবে।” এলাকাবাসীর দাবি, নজরুলের পাশাপাশি তার ভাতিজা ইঞ্জিনিয়ার মেজবা উদ্দিন বিপ্লবসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে কালীগঞ্জকে সন্ত্রাস ও দখলদারমুক্ত করা হোক।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top