চরাঞ্চলের শিশুর স্বপ্নের পথপ্রদর্শক
লালমনিরহাটের তরুণ সমাজকর্মী নাঈম রহমান
মিঠু মুরাদ | প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৫৯
লালমনিরহাট জেলা জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাঈম রহমান ছোটবেলা থেকেই সমাজের বৈষম্য লক্ষ্য করেছেন। তাঁর বাড়ি থেকে তিস্তা নদীর চরাঞ্চল খুব দূরে নয়, কিন্তু এখানকার শিশুদের জীবন নাগরিকদের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনার অভাব যেন তাদের স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। এই বাস্তবতা ছোটবেলা থেকেই নাঈম রহমানকে সমাজ পরিবর্তনের পথে অনুপ্রাণিত করে।
২০১৬ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। কাজের সময় তিনি লক্ষ্য করেন, চরাঞ্চলের অনেক শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পরিবারের অভাবে ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। শিক্ষক পরিবারে শিশুদের মতো স্বপ্ন দেখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সাহস চরাঞ্চলের শিশুরা পান না। এই অভিভাবকীয় শূন্যতা নাঈমকে নতুন উদ্যোগের দিকে ঠেলে দেয়।
লালমনি বিদ্যাপীঠের যাত্রা২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নাঈম রহমান শুরু করেন লালমনি বিদ্যাপীঠ। এটি কোনো প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষ বা পাঠ্যসূচি নেই। বরং এটি শিশুদের শিক্ষা সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ, স্বাস্থ্য জ্ঞান ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করে। চরাঞ্চলের প্রান্তিক ও নিম্নশিক্ষিত পরিবারের শিশুদের জন্য এটি ধীরে ধীরে একটি অভিভাবকের ভূমিকা পালন করছে।

লালমনি বিদ্যাপীঠ শিশুদের জন্য পরিচালিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও মাদক প্রতিরোধ, পড়াশোনায় গাইডলাইন, প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল জগতের সঙ্গে পরিচিতি। স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা এবং শিশুশিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শেখানোও প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলক ও অরাজনৈতিকভাবে।
চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা ও অর্জন
চরাঞ্চলের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিয়মিত অর্থায়নের অনিশ্চয়তা, কিছু অভিভাবকের অনাগ্রহ—সবই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি নিজে শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার ভারসাম্য রক্ষা করা নাঈমের জন্য সহজ ছিল না। তবুও তিনি বিশ্বাস করতেন, “একটি শিশুর জীবন বদলাতে পারলেই সমাজ পরিবর্তনের বীজ বপন করা যায়।”
লালমনি বিদ্যাপীঠ এখন চরাঞ্চলে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি ৮০০-এর বেশি নিম্নশিক্ষিত পরিবারের অভিভাবককে বাল্যবিবাহ না দেওয়ার অঙ্গীকার করিয়েছে এবং অর্ধশতাধিক সচেতনতা ক্যাম্প পরিচালনা করেছে। অনেক শিশুকে পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শিশুশ্রম ও মাদক থেকে দূরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো চরাঞ্চলের শিশুরা এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখছে।
প্রতিষ্ঠাতা নাঈম রহমানের লক্ষ্য
নাঈম রহমান বলেন, “চরাঞ্চলের শিশুরা মেধা বা সম্ভাবনায় পিছিয়ে নয়, তারা পিছিয়ে সুযোগের অভাবে। একজন অভিভাবকের মতো পাশে থাকলে তাদের জীবন বদলে যেতে পারে।” নিজের জন্মদিনসহ ব্যক্তিগত মুহূর্তও তিনি কাটান এসব শিশুদের সঙ্গে। তাঁর বিশ্বাস, তরুণরাই সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পর্কে নাঈম জানান, লালমনি বিদ্যাপীঠের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করে চরাঞ্চলের প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং একটি মানবিক, সচেতন ও সুযোগ-সমৃদ্ধ প্রজন্ম গড়ে তোলা তাঁর মূল লক্ষ্য।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।