হাদিসের কথা
সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতারে নবীজির নির্দেশনা ও যুক্তি
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:৩৩
ইফতার শুধু রোজা ভঙ্গ করার একটি সময় নয়; এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত এক বিশেষ মুহূর্ত। এই সময়ে বান্দার আনুগত্য, শৃঙ্খলা এবং সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা একসঙ্গে প্রকাশ পায়। দিনভর সিয়াম সাধনার পর নির্ধারিত সময়ে ইফতার করা মূলত আল্লাহর নির্দেশের প্রতি পূর্ণ সমর্পণের প্রতীক। তাই তাড়াতাড়ি ইফতার করা শুধু শারীরিক স্বস্তির বিষয় নয়; বরং এটি দ্বিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব ও সুন্নাহ।
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ
لاَ يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ
সাহল ইবনু সা‘দ (রা.) থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “লোকেরা যত দিন শীঘ্র ইফতার করবে, তত দিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৫৭)
এই হাদিসে ‘কল্যাণের ওপর থাকবে’ কথাটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে—উম্মাহ যত দিন সুন্নাহ অনুসরণ করবে এবং অপ্রয়োজনীয় কড়াকড়ি বা বিদআতের পথে যাবে না, তত দিন তারা দ্বিনের সঠিক পথে অবিচল থাকবে।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারী-তে উল্লেখ করেন, দ্রুত ইফতার করা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিরোধিতা করার একটি দিক। কারণ তারা সূর্যাস্তের পরও ইফতার বিলম্ব করত। তাই মুসলিম উম্মাহকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সূর্যাস্ত নিশ্চিত হলেই ইফতার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এতে একদিকে সুন্নাহ অনুসরণের শিক্ষা রয়েছে, অন্যদিকে আহলে কিতাবের রীতি থেকে পৃথক থাকার দিকনির্দেশনাও পাওয়া যায়।
ইমাম নববী (রহ.) শারহ সহিহ মুসলিম-এ লিখেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ইফতার বিলম্ব করা—এই ধারণা নিয়ে যে এতে বেশি ফজিলত রয়েছে—তা মাকরূহ। বরং সুন্নাহ হলো সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা। এতে শরিয়তের সহজতা ও ভারসাম্যের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
অনেক আলেম ব্যাখ্যা করেছেন, দ্রুত ইফতার করা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বাস্তব নিদর্শন। রোজা যেমন আল্লাহর আদেশে শুরু হয়, তেমনি তাঁর আদেশেই শেষ হয়। বান্দা নিজের ইচ্ছায় এক মুহূর্তও বেশি রোজা রাখে না, আবার আগে ভঙ্গও করে না। এই ভারসাম্যই প্রকৃত তাকওয়ার প্রতিফলন।
হাদিসের আলোকে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করাই উত্তম। চোখে সূর্যাস্ত দেখে যেমন ইফতার করা যায়, তেমনি আবহাওয়া অফিসের সময়সূচি, রেডিও-টেলিভিশনের ঘোষণা বা পত্রিকায় প্রকাশিত সূর্যাস্তের সময় অনুযায়ীও ইফতার করা বৈধ।
আমাদের দেশে প্রচলিত ইফতারের সময়সূচিতে অনেক সময় সতর্কতার নামে ১ থেকে ৫ মিনিট অতিরিক্ত যোগ করা হয়। কিন্তু হাদিসে বর্ণিত কল্যাণ লাভ করতে চাইলে সূর্যাস্তের সময় নিশ্চিত করে সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করাই সুন্নাহসম্মত। সূর্যাস্তের পর অকারণে ইফতার বিলম্ব করা ইহুদি ও নাসারাদের অভ্যাসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
(আবু দাউদ, হাদিস : ২২৫৩; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯৮)
শীঘ্র ইফতার করা শুধু একটি সুন্নাহ নয়; এটি উম্মাহর ঐক্য, শরিয়তের সহজতা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণের বাস্তব প্রতিফলন।
যত দিন এই সুন্নাহ জীবিত থাকবে, তত দিন উম্মাহ কল্যাণ ও হেদায়াতের ওপর অটল থাকবে—এটাই এই হাদিসের মূল শিক্ষা।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।