ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জানাজায় ঢাকা—লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়ে খালেদা জিয়া
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৪
ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জানাজার সাক্ষী হলো রাজধানী ঢাকা। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে গতকাল পুরো মহানগরী যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল জানাজার মাঠে। সকাল থেকেই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে নামে মানুষের ঢল। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষ অংশ নেন এই জানাজায়।
জাতীয় সংসদ ভবনের সব মাঠ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের প্রতিটি সড়ক হয়ে ওঠে লোকারণ্য। কফিন থেকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল জানাজার সারি। যারা সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি, তারাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের সঙ্গে জানাজায় শরিক হন।
অনেকের মতে, এটি শুধু বাংলাদেশের নয়—মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজা। মানুষের সংখ্যা ছাড়াও আবেগ, ভালোবাসা ও অশ্রুতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এই বিদায়। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বহু মানুষ এসেছিলেন একজন সংগ্রামী নারীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। নারীদের জন্যও আলাদা করে জানাজা পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। জানাজা ও দাফন শেষে সন্ধ্যা পর্যন্ত এলাকাজুড়ে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সকাল থেকেই মানুষের স্রোত
জানাজাকে ঘিরে সকাল থেকেই বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, খামারবাড়ি ও বিজয় সরণিসহ রাজধানীর প্রায় সব প্রধান সড়কে মানুষের ঢল নামে। কোথাও গাড়ি চলার জায়গা ছিল না, ছিল না পা ফেলার স্থানও।
দুপুর ২টায় জানাজা শুরুর কথা থাকলেও সকাল ১১টার মধ্যেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা পূর্ণ হয়ে যায়। মাইকে ঘোষণা দিয়ে পশ্চিম ও পূর্ব পাশের মাঠে অবস্থান নিতে অনুরোধ জানানো হয়। খামারবাড়ি মোড় থেকে সংসদ ভবনের গেট পর্যন্ত যেতে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়।
মেট্রোরেল ও অলিগলিতেও মানুষ
দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ দুই থেকে তিন কিলোমিটার আগে গাড়ি রেখে হেঁটে জানাজাস্থলের দিকে আসেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটেন। কেউ হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ দলীয় পতাকা, আবার কেউ নিঃশব্দে চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে যান।
মেট্রোরেলেও ছিল অস্বাভাবিক ভিড়। ভিড়ের কারণে অনেকেই নির্ধারিত স্টেশনে নামতে পারেননি। আগারগাঁও, ফার্মগেট ও বিজয় সরণি স্টেশনসহ আশপাশের এলাকায় দাঁড়িয়েও হাজার হাজার মানুষ জানাজায় অংশ নেন।
লাখো মানুষের নীরবতা
বিকাল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। দোয়ার সময় লাখো মানুষের নীরবতা যেন পরিণত হয় এক গভীর শোকগাথায়।
জানাজার আগে খালেদা জিয়ার জন্য সবার কাছে দোয়া চান তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন তুলে ধরেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্টজনেরা
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতারা, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং খালেদা জিয়ার পরিবার-পরিজন। জানাজা শেষে তারেক রহমানকে সান্ত্বনা জানান প্রধান উপদেষ্টা।
কান্না, ভিড় আর শোক
জানাজায় এসে বহু মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ বলছিলেন, ‘তিনি আমাদের শেষ ভরসা ছিলেন।’ ভিড়ের চাপে একজনের মৃত্যু ও কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। তবু কেউ সরে যাননি।
কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, ফুটওভারব্রিজ, ভবনের ছাদ—সবখানেই মানুষ। কেউ স্লোগান দেননি, কেউ নির্দেশনা দেননি, তবু সবাই একই দিকে এগিয়ে গেছেন—এক নীরব শৃঙ্খলায়, যা কেবল শোক থেকেই জন্ম নেয়।
রাজনীতির বাইরে সাধারণ মানুষও
জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। বেসরকারি চাকরিজীবী আমিরুল ইসলাম বলেন,
‘আমি রাজনীতি করি না। কিন্তু দেশের জন্য একজন নারী যে পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁর জানাজায় কয়েক কিলোমিটার হাঁটা কষ্টের নয়।’
একটি যুগের সমাপ্তি
অনেকের মতে, সংসদ ভবনের চারপাশ ঘিরে প্রায় ১৫–১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষের এই সমাগম বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। ত্রিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এমন দৃশ্য কেউ দেখেননি বলে মন্তব্য করেন অনেকে।
বেগম খালেদা জিয়ার এই জানাজা কেবল একটি রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয়—এটি একটি যুগের সমাপ্তি। লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলালেও মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতির জায়গা থেকে তাঁকে মুছে ফেলা যাবে না। ইতিহাসের পাতায় এই জানাজা লেখা থাকবে অশ্রু দিয়ে, লেখা থাকবে ঢাকাজুড়ে এক দিনের জন্য থেমে যাওয়া জীবনের নীরব সাক্ষ্য হিসেবে।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।