পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রলোভনে রাশিয়া, শেষে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে বাংলাদেশিরা
ডেস্ক রিপোর্ট | আন্তর্জাতিক | প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৪৭
পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন বাংলাদেশের মাকসুদুর রহমান। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিজেকে আবিষ্কার করেন ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। বেসামরিক কাজের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের রাশিয়ায় এনে জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠানোর ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানে।
এপির অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্রমিক নিয়োগকারী দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশি শ্রমিকদের রাশিয়ায় আনা হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা কারিগরি কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের অজান্তেই সামরিক চুক্তিতে সই করানো হয়। অনিচ্ছুকদের মারধর, কারাবন্দি এমনকি মৃত্যুর হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম তিন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছে এপি। তাদের একজন মাকসুদুর রহমান।
মাকসুদুর রহমান জানান,“মস্কোতে পৌঁছানোর পর আমিসহ কয়েকজন বাংলাদেশিকে রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে সই করতে বলা হয়। তখন বুঝিনি—সেগুলো ছিল সামরিক নিয়োগের চুক্তি।”
এরপর তাদের একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ড্রোন যুদ্ধ কৌশল, আহতদের সরিয়ে নেওয়া এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
তিন বাংলাদেশি জানান, ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। রুশ বাহিনী এগোনোর আগে তাদেরই আগে যেতে হতো। রসদ বহন, আহত সেনাদের উদ্ধার এবং নিহতদের মরদেহ সরিয়ে আনার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
নিখোঁজ তিন বাংলাদেশির পরিবারও জানিয়েছে, তাদের স্বজনরা একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন।
এ বিষয়ে এপির পাঠানো প্রশ্নের জবাবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশের সরকার—কেউই কোনো মন্তব্য করেনি।
শ্রমিকদের বর্ণনার পক্ষে নথিপত্রও পেয়েছে এপি। এর মধ্যে রয়েছে ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র, রুশ সামরিক চুক্তি, মেডিকেল ও পুলিশি প্রতিবেদন এবং ছবি। এসব নথিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসা, যুদ্ধে পাওয়া আঘাত এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
ঠিক কতজন বাংলাদেশি এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তা জানা যায়নি। তবে যারা এপির সঙ্গে কথা বলেছেন, তারা জানিয়েছেন—ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সঙ্গে শত শত বাংলাদেশিকে তারা দেখেছেন।
মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়া আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে—বিশেষ করে ভারত ও নেপালের পুরুষদেরও সামরিক নিয়োগের লক্ষ্যবস্তু করছে।
২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় চুক্তিভিত্তিক কাজ শেষ করে লক্ষ্মীপুরে ফেরেন মাকসুদুর রহমান। নতুন কাজের খোঁজে থাকা অবস্থায় এক দালাল তাকে রাশিয়ায় সামরিক ক্যাম্পে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির প্রস্তাব দেয়। মাসে এক থেকে দেড় হাজার ডলার বেতন ও স্থায়ী বসবাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
রাশিয়ায় পৌঁছে তিনি ও আরও তিন বাংলাদেশি রুশ ভাষার একটি নথিতে সই করেন, যা তারা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চুক্তি ভেবেছিলেন।
অন্যদিকে, মোহন মিয়াজী রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের একটি গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে গিয়ে চরম শীত ও কঠোর পরিবেশে বিপর্যস্ত হন। পরে অনলাইনে কাজ খুঁজতে গিয়ে একজন রাশিয়ান সেনা নিয়োগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে অধিকৃত শহর আভদিভকায় একটি সামরিক ক্যাম্পে নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “আমি বলেছিলাম, আমাকে ইলেকট্রিক্যাল কাজের জন্য পাঠানো হয়েছে। আদেশ মানতে অস্বীকার করলে বেলচা দিয়ে মারা হয়, হাতকড়া পরিয়ে বেসমেন্টের একটি সেলে নির্যাতন করা হয়।”
মুন্সীগঞ্জে নিজ গ্রামে ফিরে এসে এপিকে এসব ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।