বৃহঃস্পতিবার, ৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

তাহের-খালেদ-জিয়া! কে নায়ক, কে ভিলেন?

৭ নভেম্বর : আসলে তুমি কার ?

রায়হান রাজীব | প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর ২০২৩, ১৩:০৭

ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসের ঘটনাবহুল ৭ নভেম্বর আজ। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে দ্রুত রাজনৈতিক উত্থান পতন ঘটতে থাকে। এদিনে আধিপত্যবাদী শক্তির নীল নকশা প্রতিহত করে সিপাহী জনতা। রক্ষা করে স্বাধীনতা -সার্বভৌমত্ব।

৭ নভেম্বরের মূল চরিত্র তিনজন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান, সাবেক ক্ষণস্থায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের।

বিএনপি দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে। জাসদ পালন করে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে। আর আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল অনেক দল ৭ নভেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস হিসেবে পালন করে।

জাসদ বলছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর থেকে ক্ষমতা দখল- পুনর্দখলের জন্য পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয় সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তারা। এ প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের এই দিনে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান ঘটেছিল।

আওয়ামী লীগ মনে করে, সিপাহী বিপ্লবের নামে এদিন থেকে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা সেনা সদস্যদের হত্যা প্রক্রিয়া। শেষ হয় ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। বিএনপির মতে, সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ক্রান্তিকালে দেশ পরিচালনা করেছেন।

৭ নভেম্বর : কার লাভ-কারক্ষতি ?

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল। সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিল না চেইন অব কমান্ড। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের উৎখাত করতে ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান হয়। এ অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে আটক করা হয়। কিন্তু তার আগেই মোশতাক-জিয়া চক্র বুঝতে পারে তাদের ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে।

সে আশঙ্কা থেকে ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের আগের রাতেই মোশতাক গং জিয়া-ফারুক-রশিদরা বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটায়। পরিকল্পিতভাবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা— বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা করে।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের পর খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান হয়ে খন্দকার মোশতাককে গ্রেপ্তার করেন। অবস্থা বেগতিক বুঝে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক-রশিদ-ডালিমরা থাইল্যান্ডে পালিয়ে যায়। কিন্তু জাসদ নেতা কর্নেল তাহের ৭ নভেম্বর এক পাল্টা অভ্যুত্থানে জিয়াকে মুক্ত করে। হত্যা করা হয় সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ, সেক্টর কমান্ডার এটিএম হায়দার ও সাব-সেক্টর কমান্ডার খন্দকার নাজমুল হুদাকে।

৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ছিল কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। কিন্তু পরবর্তী জেনারেল জিয়ার কূটকৌশলে কর্নেল তাহের ও জাসদ পরাজিত হয়। ক্ষমতার নিরঙ্কুশ অধিকারী হন জিয়াউর রহমান।

যে অভ্যুত্থানের কারণে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন জিয়া, উল্টো সেই অভ্যুত্থানের দোষারোপে ২৪ নভেম্বর কর্নেল তাহের, মেজর জলিলসহ শীর্ষস্থানীয় জাসদ নেতা ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সৈনিকদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই কথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে প্রাণদাতা কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন জিয়াউর রহমান। অন্যদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের সময় জিয়াউর রহমানকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন কর্নেল তাহের।

কর্নেল তাহেরের জবানবন্দি:

কর্নেল তাহের তাঁর আদালতে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেছেন, ৬ নভেম্বর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। ৭ নভেম্বর ভোররাত একটায় সিপাহি অভ্যুত্থান শুরু হবে বলে ঠিক হয়। আমাদের সিদ্ধান্তগুলো ছিল: ১. খালেদ মোশাররফ চক্রকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা, ২. বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা, ৩. একটা বিপ্লবী সামরিক কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা, ৪. দল-মতনির্বিশেষে সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি দান, ৫. রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার, ৬. বাকশালকে বাদ দিয়ে একটা সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন করা, ৭. বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফা দাবি মেনে নেওয়া ও তার বাস্তবায়ন করা। সবকিছুই পরিকল্পনামাফিক হয়। বেতার, টিভি, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, পোস্ট অফিস, বিমানবন্দর ও অন্যান্য সব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র প্রথম আঘাতেই দখল করা হয়।

ভোর রাতে জিয়াকে মুক্ত করে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার বড় ভাই ফ্লাইট সার্জেন্ট আবু ইউসুফ খানের সঙ্গে আমি ভোর তিনটার দিকে সেনানিবাসে যাই। সঙ্গে ছিল ট্রাকভর্তি সেনাদল। জিয়াকে আমি তাঁর নৈশ পোশাকে পেলাম। সেখানে ব্রিগেডিয়ার মীর শওকতসহ আরও কয়েকজন অফিসার ও সৈনিক ছিল। জিয়া আমাকে আর আমার ভাইকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করলেন। জলভরা চোখে তিনি আমাদের তাঁর জীবন বাঁচানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানালেন। তাঁর জীবন রক্ষার জন্য জাসদ যা করেছে, তার জন্য জিয়া আমার প্রতি ও জাসদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললেন, আমরা যা বলব, তিনি তা-ই করবেন। আমরা তখন পরবর্তী করণীয় নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করি। তখন ভোর চারটা। আমরা একসঙ্গে বেতার ভবনে পৌঁছাই।

পথে আমরা তাৎক্ষণিক কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করি। এর মধ্যে বেতার থেকে সিপাহি অভ্যুত্থানের ঘোষণা করা হয়। জিয়াকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা দেওয়া হয়। বেতার ভবনে যাওয়ার পথে জিয়া শহীদ মিনারে একটা জনসমাবেশে ভাষণ দিতে রাজি হয়েছিলেন। তাই কথামতো আমি শহীদ মিনারে সমবেত হতে সিপাহিদের নির্দেশ দিয়েছিলাম। ঠিক হয়, সেখানে আমি ও জিয়া সমাবেশে ভাষণ দেব। তাহলে অফিসারদের ছাড়াই যে বিপ্লবী সৈনিকেরা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে, সেই সৈনিকদের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার থেকে কেউ পিছু হটাতে পারবে না।

কর্নেল তাহের কী চেয়েছিলেন:

অভ্যুত্থান- পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কর্নেল তাহের ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন। জেনারেল জিয়ার কাঁধে বন্দুক রেখে ক্ষমতা শিকার করতে চেয়েছিলেন জাসদ ও কর্নেল তাহের। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সময়মতো কর্নেল তাহেরের দিকেই নিয়ে ট্রিগার টিপে দিয়েছিলেন জেনারেল জিয়া।

কর্নেল তাহের পরিকল্পনা করেছিলেন অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া সৈন্যরা অস্ত্র হাতে রাস্তায় বেরিয়ে আসবে। তিনি সৈন্যদের বলেছিলেন প্রত্যেকে কয়েকটি অস্ত্র হাতে বেরিয়ে আসবে। আর বাইরে অপেক্ষমাণ আমাদের শ্রমিক ও ছাত্ররা সশস্ত্র হবে। এভাবেই সৈনিক জনতার অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন কর্নেল তাহের।

তাদের লক্ষ্য ছিল অভ্যুত্থানের পর একটি বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল হবে, রাজবন্দীদের মুক্ত করা হবে এবং দেশে একটা সাধারণ নির্বাচন দেয়া হবে। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পেছনে জাসদ এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কিছু রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছিল। তারা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাদের পাশে চেয়েছিলেন।

প্রাণ বাঁচাতে জিয়ার বার্তা:

জিয়াউর রহমানকে যখন বন্দি করা হয় তখন তিনি কর্নেল তাহেরকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন যেন তাকে উদ্ধার করা হয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে কর্নেল তাহের এবং জিয়াউর রহমান পরস্পরকে জানতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমান শীর্ষ সেনানায়ক ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তিনি একটি স্বাধীনতার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। সে কারণে তার পরিচিতি ছিল। কর্নেল তাহের ভেবেছিলেন জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হলে তিনি আমাদের পাশে থাকবেন।

কিন্তু জিয়াউর রহমান মুক্ত হবার পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। দৃশ্যপটের সামনে চলে আসেন জিয়াউর রহমান এবং আড়ালে যেতে থাকেন কর্নেল তাহের। জিয়াউর রহমানের সে আচরণকে 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে মনে করে জাসদ।

গবেষক যা বলছেন:

গোলাম মুরশিদ তার ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’ গ্রন্থে লিখেছেন, হাঁ-না ভোটের মাধ্যমে  জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও তার আমলে ২০টির বেশি অভ্যুত্থথান হয়েছিল। এসব অভ্যুত্থানে অনেক সামরিক সদস্য নিহত হন। প্রায় প্রতি তিন মাসে একটি করে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল জিয়ার শাসন আমলে। প্রতিটি অভ্যুত্থানের পর বহু সেনা সদস্যকে তিনি ফাঁসিতে ঝোলান। অনেককে বিনা বিচারে পাইকারিভাবে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়। বিশেষ করে ৭৭ সালের ২ অক্টোবর বিমান বাহিনীর অভ্যুত্থানের পর শত শত লোককে বিনা বিচারে অথবা সংক্ষিপ্ত বিচারে হত্যা করা হয়। ফলে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, বিমান-বাহিনীতে মাত্র ১১ জন কর্মকর্তা থাকেন। তাদের মধ্যে বিমান চালাতে পারতেন মাত্র তিনজন। মার্কাস ফ্র্যান্ডার মতে এই অভ্যুত্থানের কারণে আড়াই হাজার সেনা সদস্য নিহত হয়।

রিজভী বলেন সকল দল, সকল সংবাদপত্র, সমস্ত কিছুকে বন্ধ করে দিয়ে একটি দল এবং সরকারের অনুগত চারটি সংবাদপত্র এবং কথা বলার স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করে দিয়ে বাকশাল কায়েম করা হয়েছিল। সেই বাকশাল থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হয়েছিল ৭ই নভেম্বরের সেই বিপ্লবের মধ্যদিয়ে।

নিবন্ধটি কয়েকজন লেখক ও ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

 




পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top