সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২

উত্তরাঞ্চলকে এগিয়ে নিতে নির্বাচনী নতুন ছক করছে জামায়েত

স্টাফ রিপোর্টার । ঢাকা | প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৭

ছবি: সংগৃহীত

এক সময় উত্তরাঞ্চলকে জাতীয় পার্টির (জাপা) ‘অভেদ্য দুর্গ’ বলা হতো। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের লাঙলের সেই শক্ত ঘাঁটিতে এবার ভোটের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় জাপার কার্যক্রম যেখানে অনেকটাই নীরব, সেখানে পুরো উত্তরবঙ্গ চষে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। এ অঞ্চলে বিএনপিরও যে বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে ফলাফল ঘরে তুলতে তৎপর রয়েছে দলটি।

গত দুই দিনে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় একের পর এক নির্বাচনী সমাবেশ ও শোডাউন করেছে এই জোট। জোটের শীর্ষ নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে এসব সমাবেশে হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে। অন্যদিকে, রংপুরের সন্তান ও জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ৩০ জন প্রার্থী দিলেও তাদের বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়েনি।

প্রতীক বরাদ্দের পর গত বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোয় দলটির দৃশ্যমান কার্যক্রম খুবই সীমিত।

খোদ জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী হলেও গত তিন দিনে বড় কোনো সভা-সমাবেশ করেননি। সীমিত পরিসরে গণসংযোগ ও ঘরোয়া বৈঠকেই সীমাবদ্ধ রয়েছে দলটির কার্যক্রম। জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ ও ৫ আসনে প্রচার চালালেও তা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক।

এর বিপরীতে শুক্রবার ও শনিবার উত্তরাঞ্চলজুড়ে ঝটিকা সফর করেছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে বিশাল সব জনসভায় তিনি সরকার গঠন করলে উত্তরাঞ্চলকে ‘কৃষি শিল্পের রাজধানী’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এসব সমাবেশে জোটসঙ্গী এনসিপির প্রার্থীদের হাতে ‘শাপলা কলি’ ও জামায়াত প্রার্থীদের হাতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক তুলে দিয়ে ধানের শীষহীন মাঠে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছেন।

রংপুর সদরের জাহাজ মোড় এলাকার চায়ের দোকানদার তরিকুল ইসলাম বলেন, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ মারা যাওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে জাতীয় পার্টি ভেঙে পড়েছে। তার প্রভাবও রংপুরে পড়েছে। এবারের নির্বাচনে এই এলাকায় দাঁড়িপাল্লার প্রচার বেশি দেখা যাচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের বঞ্চনা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত দিনে এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত ও পিছিয়ে রাখা হয়েছে। আল্লাহ সুযোগ দিলে ইনসাফের ভিত্তিতে এই অঞ্চলকে এগিয়ে নেওয়া হবে। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

 

পঞ্চগড়ে বন্ধ চিনিকল চালুর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে সংরক্ষণাগার ও সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। বগুড়ার জনসভায় তিনি বগুড়াকে সিটি করপোরেশন এবং সেখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া সিরাজগঞ্জে যমুনা নদী শাসন ও খননের মাধ্যমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের অঙ্গীকার করেন।

পঞ্চগড় বিসিক এলাকার বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন হিমেল বলেন, এই এলাকা কৃষিনির্ভর। পর্যাপ্ত উৎপাদন হলেও কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য পায় না। এই এলাকার উন্নয়নের জন্য যিনি কাজ করবেন, তাকেই ভোট দেব। তবে এই অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামী অতীতের তুলনায় ভালো করবে এবার।

তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে জামায়াত আমির স্পষ্ট করে বলেন, আমরা যুবকদের বেকার ভাতা দিয়ে বসিয়ে রাখতে চাই না। আমরা আপনাদের হাতে কাজ দিতে চাই, যাতে আপনারা মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারেন। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে সেই অর্থ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।

উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে এবার জাতীয় পার্টির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত অক্টোবরে রংপুরে এনসিপি নেতা সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে জাপার পক্ষ থেকে ‘অবাঞ্ছিত ঘোষণা করায় দুই দলের দূরত্ব প্রকাশ্যে আসে।

এবার সেই এনসিপিকে সঙ্গে নিয়েই জোটবদ্ধ নির্বাচন করছে জামায়াত। পঞ্চগড়-১ আসনে সারজিস আলম, রংপুর-৪ আসনে আখতার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন এনসিপি প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি ভোট চেয়েছেন জামায়াত আমির। এনসিপি নেতারাও তাদের বক্তব্যে তিস্তা ইস্যু, সীমান্ত হত্যা ও ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে কড়া বার্তা দিচ্ছেন, যা ভোটারদের নজর কাড়ছে।

মাঠে নীরব থাকলেও গত ২২ জানুয়ারি রংপুরে এক সভায় জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের অভিযোগ করেন, তাদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং তারা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ পাচ্ছেন না। সংস্কার প্রস্তাব ও গণভোটের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এই গণভোট সংবিধানবিরোধী ও অবাস্তব। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশ অস্থিতিশীলতার দিকে যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক চাপের কারণেই জাপা এবার রক্ষণাত্মক কৌশলে এগোচ্ছে।

শনিবার সকালে রংপুরের পীরগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, দেশের এক ইঞ্চি জমির সম্মান আমরা কারও কাছে বন্ধক রাখব না। আবু সাঈদেরা বুক পেতে দিয়ে যেভাবে দেশের আমানত রক্ষা করেছে, আমরাও জীবন দিয়ে সেই আমানত রক্ষা করব।

দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনব। বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর যে স্বাধীনতা এসেছে, তাকে অর্থবহ করতে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, এক সময়ের লাঙলের দুর্গে এবার জামায়াত ও এনসিপি জোটের এই ব্যাপক শোডাউন এবং জাপার নীরবতা উত্তরাঞ্চলের ভোটের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রসঙ্গত, রংপুর বিভাগে মোট আটটি জেলায় জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা ৩৩টি। এর মধ্যে দিনাজপুরে ৬টি, রংপুরে ৬টি, গাইবান্ধায় ৫টি, কুড়িগ্রামে ৪টি, নীলফামারীতে ৪টি, লালমনিরহাটে ৩টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩টি এবং পঞ্চগড়ে দুটি আসন রয়েছে।

দেশের অবহেলিত উত্তরবঙ্গে রয়েছে বিএনপির একটি বিশাল ভোটব্যাংক। এই ভোটব্যাংক কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী ফল ঘরে তুলতে তৎপর বিএনপি নেতাকর্মীরা।

বগুড়ার মহাস্থানগড় এলাকার বিএনপি কর্মী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বগুড়ার বাসিন্দা। গত ১৫ বছর আমরা ভোট দিতে পারিনি। ভোট হলে এই এলাকার সবকটি আসন বিএনপির ঘরে যাবে বলে বিশ্বাস করি।

 



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top