ট্রাম্পের ৫০০ শতাংশ শুল্ক হুমকি: ভারতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:১২
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সংক্রান্ত একটি বিল—‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’—মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত হওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলটি পাস হলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর ওপর রাশিয়া থেকে সস্তা তেল কেনা বন্ধে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বিলটির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, এখনো এ বিষয়ে কংগ্রেসে ভোটাভুটি হয়নি।
বাণিজ্য চুক্তি অনিশ্চয়তা ও ট্রাম্পের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বহুল আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক দাবি করেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন না করায় আলোচনা এগোয়নি।
এদিকে ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, তার সিদ্ধান্ত থামাতে পারে কেবল তার ‘নিজস্ব নৈতিকতা ও মন’। এমন বক্তব্যের পর ভারতে প্রশ্ন উঠেছে—মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের কি আদৌ কোনো সীমা আছে?
ভারতে সম্ভাব্য প্রভাব
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে আসছে। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক হুমকির পর ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কিছুটা কমালেও পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিলটি কার্যকর হলে ভারতকে দুটি পথের একটিতে যেতে হবে—
-
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা, অথবা
-
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে ৫০০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়া।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই)–এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন,
“৫০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। এতে প্রায় ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।”
তিনি আরও বলেন,
“ভারতের উচিত পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া—রাশিয়া থেকে তেল কিনবে কি না, তা স্পষ্টভাবে জানানো।”
রাশিয়ান তেল আমদানি কমছে
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, চলতি জানুয়ারিতে তারা রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির আশা করছে না। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এতে চলতি বছরে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে।
ব্লুমবার্গ জানায়,
-
গত জুনে প্রতিদিন ২১ লাখ ব্যারেল রাশিয়ান তেল আমদানির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে
-
ডিসেম্বরে তা ৪০ শতাংশ কমেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রে ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
চীন-ভারত পার্থক্য ও কৌশলগত রাজনীতি
ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ইকোনমিক টাইমস বলছে, প্রস্তাবিত বিলটি মূলত ভারতকেই নিশানা করছে, যেখানে চীন অনেকটাই নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে।
এখন পর্যন্ত রাশিয়ান তেল ইস্যুতে
-
ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও
-
চীনের বিরুদ্ধে কোনো বড় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, ভারত সরকার চীনা কোম্পানির ওপর থাকা পাঁচ বছরের পুরোনো সরকারি টেন্ডার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথাও ভাবছে।
ভূ-রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কৌশল
শুল্ক বিলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ভারত-নেতৃত্বাধীন **ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স (আইএসএ)**সহ প্রায় এক ডজন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রত্যাহার করেছে।
এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অনন্ত সেন্টারের সিইও ইন্দ্রাণী বাগচী বলেন,
“ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব থেকেই এই বিল সামনে আনা হয়েছে।”
তার মতে, বিল পাস হলেও প্রেসিডেন্টের ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু ভারত-মার্কিন সম্পর্ক আগামী কিছু সময়ের জন্য ‘আইসিইউ’তে থাকবে।
বাণিজ্য অস্ত্রায়ন ও বিকল্প বাজারের প্রয়োজন
প্রাক্তন বাণিজ্য সচিব অজয় দুয়া বলেন,
“৫০০ শতাংশ শুল্ক আসলে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার শামিল। এ শুল্ক কার্যকর হলে আমেরিকার কেউই ভারতীয় পণ্য কিনতে পারবে না।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন,
“ভারতকে দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে হবে।”
সূত্র: বিবিসি
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।