মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২

ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে ইসরায়েল

নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০ মার্চ ২০২৬, ১২:৫১

ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ওপর চলমান ক্রমবর্ধমান ও অনির্দিষ্টকালীন হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন ইসরায়েলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তারা এমন কিছু সম্ভাব্য ‘প্রস্থান পথ’ বা সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যার মাধ্যমে যুদ্ধ আরও বিস্তার লাভ করার আগেই থেমে যেতে পারে এবং অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

যুদ্ধের শেষ পরিণতি নিয়ে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। হামলা বন্ধ করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর। তিনি এখনো পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের লক্ষ্যেই এগোতে চান বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রোববার এক টেলিফোন আলাপে ইরান যুদ্ধের পরিকল্পনা ও কৌশলের সঙ্গে পরিচিত এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা ট্রাম্পের দাবি করা ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর বিকল্প কিছু সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন সময় ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। শুরুতে তিনি ইরানি শাসনব্যবস্থার কিছু নমনীয় সদস্যের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি আত্মসমর্পণের দাবি তোলেন। তার ভাষ্য ছিল, যাদের সঙ্গে আলোচনার কথা ভাবা হয়েছিল তারা ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন। ট্রাম্পের মতোই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি শনিবার পরিস্থিতিকে ‘সত্যের মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

এদিকে রোববার ঘোষণায় জানানো হয়, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন মোজতবা খামেনি। তিনি প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তার আবাসিক এলাকায় চালানো বিমান হামলায় আলী খামেনি নিহত হন। নতুন এই নেতা কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তার সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা খুবই কম।

গত কয়েক দিনে বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে জানা যায়, যুদ্ধের মূল্য ক্রমাগত বাড়ছে—এটাই প্রধান উদ্বেগ। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জনসমর্থন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়ানোর কারণে ট্রাম্প নিজেও রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

ইসরায়েলের ওই কর্মকর্তা বলেন, শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইসরায়েলের স্বার্থে কি না তা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে। তার ভাষায়, কেউই অনির্দিষ্টকাল ধরে চলা কোনো সংঘাত চায় না।

তার মতে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বোমা হামলা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রধান সামরিক লক্ষ্যগুলো প্রায় অর্জিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বোমাবর্ষণের পর ইরানের অবশিষ্ট পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের কাছাকাছি রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সামরিক ও গোয়েন্দা নেতৃত্বও লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য পূরণে ঠিক কত সময় লাগতে পারে সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তিনি বলেন, শাসনব্যবস্থার পতন অবশ্যই একটি লক্ষ্য হলেও সেটিই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বড় বড় সামরিক লক্ষ্য ধ্বংস হয়ে গেলেও ইসরায়েল তার উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে। তার মতে, ইরান সরাসরি আত্মসমর্পণ করবে না, তবে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার বার্তা পাঠাতে পারে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইসরায়েল শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে চায়। তবে প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন একটি মত রয়েছে যে যুদ্ধের সমাপ্তি প্রয়োজন। বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো কৌশলগত শেষ লক্ষ্য না থাকায় অনেকেই নেতানিয়াহুর কৌশল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কে আসতে পারে সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মধ্যেও একই ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। তার মতে, ইরানের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামো কিছুটা দুর্বল হলেও দ্রুত শাসনব্যবস্থার পতনের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, কুর্দি বা অন্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার কৌশল কার্যকর নাও হতে পারে। এতে ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো—নেতানিয়াহু যেন লেবাননে বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু না করেন, যার লক্ষ্য হতে পারে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। ওই কর্মকর্তা বলেন, নতুন আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ইসরায়েলের সঙ্গে জোট নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রশ্ন উঠছে। তিনি বলেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টেনে নিতে চায় না এবং একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবেই থাকতে চায়।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top