বাংলাদেশের পর্যটন খাতে অপার সম্ভাবনা থাকলেও পিছিয়ে কেন?
নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:১৯
বাংলাদেশ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য দেশ—বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এবং হাজার বছরের পুরোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মিলিয়ে এ দেশ পর্যটনের জন্য স্বর্গতুল্য। তবুও এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিতে পৌঁছাতে পারেনি।
পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন দশকে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা খুবই ধীরগতিতে বেড়েছে। ১৯৯৫ সালে যেখানে বিদেশি পর্যটক ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজারে। সব মিলিয়ে ৩০ বছরে দেশে বিদেশি পর্যটক এসেছে প্রায় ৮৬ লাখের মতো। বৈশ্বিক পর্যটন বাজারের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধীরগতির অগ্রগতির পেছনের কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পর্যটন খাত পিছিয়ে থাকার পেছনে বেশ কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে।
অবকাঠামোর দুর্বলতা: পর্যটন সুবিধা, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং আবাসনের মান এখনো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছায়নি। দীর্ঘ যানজট ও সীমিত মানসম্মত হোটেল বিদেশি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে।
আকাশপথের সীমাবদ্ধতা: আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সীমিত গন্তব্য ও উচ্চ ভাড়া পর্যটকদের জন্য বড় বাধা। ফলে ইউরোপ-আমেরিকার পর্যটক আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রচারের ঘাটতি: বিশ্বব্যাপী পর্যটন ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং কার্যক্রম দুর্বল হওয়ায় বাংলাদেশ যথাযথ পরিচিতি পাচ্ছে না।
নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা সংকট: পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও চুরি, হয়রানি বা অনিয়মের কারণে অনেক বিদেশি পর্যটক আস্থাহীনতায় ভোগেন।
উচ্চ ব্যয়, নিম্নমান সেবা: অনেক ক্ষেত্রে খরচ বেশি হলেও সেবার মান আন্তর্জাতিক মানের নয়।
সমন্বয়ের অভাব: ট্যুরিজম বোর্ড, পর্যটন করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই, যা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
দক্ষ জনবল ও তথ্যের ঘাটতি: পর্যটন সেবায় পেশাদারিত্বের অভাব এবং হালনাগাদ তথ্যের অনুপস্থিতিও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পর্যটকের উৎস ও বাজারের বাস্তবতা
বাংলাদেশে আসা পর্যটকদের বড় অংশই প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আসে। পশ্চিমা দেশ—ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে আসা পর্যটকের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অথচ বিশ্ব পর্যটন বাজারের বড় অংশই এই অঞ্চলগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
পর্যটন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পর্যটন এলাকাগুলোর ধারণক্ষমতা ঠিকভাবে নির্ধারণ না করা এবং অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া। পাশাপাশি ভ্রমণ ও আবাসন খরচও পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে।
ট্যুর অপারেটর ও হোটেল মালিকদের মতে, সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবায়নের অভাবই মূল বাধা। একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ না করলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টার প্ল্যান প্রয়োজন। অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক মানের প্রচার, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং পর্যটন সেবায় আধুনিকীকরণ—এসব পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের পর্যটন খাত সম্ভাবনায় ভরপুর হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাবে তা এখনো পূর্ণ বিকাশের অপেক্ষায় রয়ে গেছে।
এনএফ৭১/ওতু
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।