ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা: কী বলছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ
স্টাফ রিপোর্টার । ঢাকা | প্রকাশিত: ৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬:১৫
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোক প্রকাশ এবং ঢাকায় তার জানাজায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের উপস্থিতি—এসব ঘটনাকে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য সরকারের প্রতি ভারতের একটি নতুন ধরনের কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা চরমে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘ভারত ও বাংলাদেশ কি সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পারবে?’—এই উপশিরোনামে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দুই দেশের টানাপড়েনের নানা দিক তুলে ধরেছেন।
প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে কুগেলম্যান উল্লেখ করেন, সোমবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্রিকেট লিগ আইপিএল (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাংলাদেশি তারকা ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার পরই এ সিদ্ধান্ত আসে। মাত্র এক মাস আগেই তিনি দলে যোগ দিয়েছিলেন।
তাকে দল থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে আনুষ্ঠানিক কোনো কারণ জানানো হয়নি। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নির্দেশে হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারতে খেলতে যাবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট সাধারণত ঐক্যের প্রতীক হলেও, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপড়েন কতটা গভীর—তারই ইঙ্গিত দেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এই উত্তেজনা এখন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের একটি বড় অংশের জনগণের ধারণা—ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে। অন্যদিকে ভারতের একটি অংশ মনে করে, শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতবিরোধী শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে আরও জোরালো করেছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ। ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে, প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতিও দিয়েছে এবং ঢাকার দাবির পরও তাকে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এদিকে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই নভেম্বরে একটি বাংলাদেশি আদালত তাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন।
ভারতের বরাত দিয়ে মাইকেল কুগেলম্যান লিখেছেন, দিল্লি নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত। যদিও অতীতে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল টানাপড়েনপূর্ণ, তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী দল হিসেবে বিএনপি এখন ভারতের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার ছেলে তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো উষ্ণ সমবেদনা বার্তা এবং ঢাকায় জানাজায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের উপস্থিতিকে সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তারেক রহমান জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঐক্যের ডাক পরোক্ষভাবে ভারতের প্রতি একটি বার্তা হতে পারে—যে, বিএনপি সরকার গঠন করলে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বাস্তবতা কি দুই দেশের জন্যই আপসের সুযোগ সীমিত করে দেবে? বাংলাদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিরোধী। এতে ঢাকায় নতুন সরকারের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। কারণ, নিজ দেশে তিনি এখনও ব্যাপক জনপ্রিয়।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক হতে পারে, তবে তা অবশ্যই ‘সমঅধিকারভিত্তিক’ হতে হবে। এর আগে অক্টোবরে তারেক রহমানও বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘ঠাণ্ডা’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশের জনগণ, তাই তাকেও জনগণের পাশেই দাঁড়াতে হবে।
সবশেষে কুগেলম্যানের বিশ্লেষণ—বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ এনে দিতে পারে। তবে সেই সুযোগ বাস্তবে রূপ নিতে হলে উভয় দেশকেই রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখাতে হবে।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।