রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

পকেটে মাত্র ৫০০ টাকা নিয়ে শুরু, আজ চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক

সামাজিক কথন ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:০৪

ছবি: সংগৃহীত

পকেটে মাত্র ৫০০ টাকা। সঙ্গে একরাশ অনিশ্চয়তা। পড়াশোনাকে ‘চিরতরে বিদায়’ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পা রেখেছিলেন গিয়াস উদ্দিন। তখন বয়স মাত্র ১৬। ভাবনায় ছিল—থাই গ্লাসের কাজ শিখবেন, কাজ করবেন।

কিন্তু সেই দিনটি তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ছিল। আজ গিয়াস উদ্দিন চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক।

১৯৯৯ সালের জন্ম গিয়াস উদ্দিনের ফেনী সদর উপজেলার পশ্চিম ছনুয়া গ্রামে। গ্রামের স্কুল থেকেই মাধ্যমিক পাস করেন। উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট।

চট্টগ্রামে আসার দিনটি আজও স্মরণীয়। বাস থেকে নেমেই নন্দনকাননের একটি দোকানে ব্যাগ রেখে ‘ওস্তাদ’ (সুপারভাইজার) নওশাদ ভাইয়ের সঙ্গে থাই গ্লাসের কাজে যোগ দেন। প্রথম কাজ ছিল আলকরণ এলাকার একটি বাসায়। পরবর্তীতে আলুর গুদামে কাজও করেছেন।

মেধাবী ছাত্র গিয়াস মাধ্যমিকে পেয়েছিলেন জিপিএ-৫, কিন্তু পড়াশোনার খরচ বহন করতেন মেজ ভাই। এরপর বাধ্য হয়ে কাজ শুরু করতে হয়।

কাজের মাঝে পড়াশোনার আগ্রহ ভেতরে-ভেতরে জাগছিল। একবার কাজ করার সময় দেখলেন, বাড়ির মেয়েটি গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ছে। কষ্ট হয়েছিল, মনে মনে ভাবলেন, “আমারও তো এখন পড়ার টেবিলে থাকা উচিত।”

একদিন নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির এক বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে, মালিকের ছেলের পরীক্ষার সময় পড়ায় ব্যাঘাত ঘটায় বকাঝকা পান। সেই দিনই মনে জেদ হয়—পড়াশোনা আবার শুরু করতে হবে।

এক বছরের বিরতির পর চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন মানবিক বিভাগে। সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস, বাকি সময় কাজ। সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন অচেনা।

চৈতন্য গলির আলুর গুদামে ছোট্ট ঘরে পাঁচজন ঘুমাতেন, বই রাখার জায়গাও ছিল না। সুযোগ পেলেই ডিসি হিল পার্কে বসে পড়াশোনা করতেন। নন্দনকাননের সহকর্মী তাঁর আগ্রহ দেখে বলেছিলেন, “এই জায়গা তোমার জন্য না, পড়াশোনায় মন দাও।” তখন বন্ধুর ভগ্নিপতির আসবাবের দোকানে কাজ পেয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান।

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য গ্রামের তিন মাস ছিলেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হন। ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি প্রথমবার ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখেন।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকেই টিউশনি করতেন। প্রথম বর্ষেই টিউশনি পাওয়া কঠিন হলেও, পড়াশোনা ও মা-বাবার খরচ চালাতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ৩.৫৮ সিজিপিএ নিয়ে।

নন্দনকানন গ্লাস মার্কেটের প্রথম ‘ওস্তাদ’ নওশাদ ভাই ও পরবর্তী ‘রহমান ভাই’-কে ধন্যবাদ জানালেন। বন্ধুদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন আরাফাতকে।

বর্তমানে গিয়াস উদ্দিন পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক। তবে নিজেকে এখনো শিক্ষার্থী মনে করেন। তিনি বলেন,

“লড়াই তো সবে শুরু। সামনে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।”



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top