রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

সরকারি এলপিজি প্রকল্পে অচলাবস্থা, বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি বাজার

বাণিজ্য ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২৩

এলপিজি । ছবি: সংগৃহীত

দেশে সরকারিভাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর মাধ্যমে এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেগুলোর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পগুলোর ফাইল মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকায় বাস্তবায়ন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে।

বর্তমানে দেশের এলপি গ্যাসের মোট চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ বিপিসির রাষ্ট্রীয় এলপিজি প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ করা হয়। বাকি ৯৮ শতাংশ চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি খাত। বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারিভাবে পর্যাপ্ত এলপিজি সরবরাহ থাকলে বেসরকারি খাত এভাবে ভোক্তাদের জিম্মি করতে পারত না। ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি খাত পুরোপুরি বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত বিপিসির এলপিজি বটলিং প্ল্যান্টে এলপিজি সরবরাহ আসে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে। তবে রিফাইনারির মেরামত কাজের কারণে চলতি ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে আগের মজুত থেকে দৈনিক ১২-১৩টি গাড়িতে এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে, যেখানে আগে দৈনিক প্রায় ২২টি গাড়ি এলপিজি সরবরাহ দেওয়া হতো।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় চার বছর আগে খুলনায় সরকারিভাবে একটি এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের জন্য সাড়ে ছয় একর জমি প্রস্তুত থাকলেও অজ্ঞাত কারণে এর কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ১ লাখ মেট্রিক টন এলপিজি সরবরাহ সম্ভব হতো। তিন মাস আগে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এছাড়া একই সময়ে চট্টগ্রামের কাট্টলি এলাকায় আরেকটি বড় এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ৪০ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি বেটার্মিনাল থেকে আরও ৪০ একর জমি চাওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন এলপিজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পটির ফাইলও ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

সূত্র জানায়, ১৯৭৭-৭৮ সালে পতেঙ্গায় এলপিজি বটলিং প্ল্যান্টটি নির্মাণ করা হয়। চট্টগ্রামে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ১৭ ধরনের জ্বালানি উৎপাদনের সময় উচ্ছিষ্ট হিসেবে এলপিজি পাওয়া যায়। গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহের জন্য পতেঙ্গায় বটলিং প্ল্যান্ট চালু করা হয়।

গত তিন বছরে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এলপিজি উৎপাদন বেড়েছে। আগে যেখানে মাসে প্রায় ১২০০ মেট্রিক টন এলপিজি উৎপাদন হতো, এখন তা বেড়ে ১৫০০ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। তবে বিপিসির পুরোনো বটলিং প্ল্যান্টের সক্ষমতা কম থাকায় সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। এক বছর আগে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়নের মাধ্যমে প্ল্যান্টটির সক্ষমতা বাড়ানো হয়। বর্তমানে অটোমেশন সিস্টেমে দৈনিক প্রায় ২৮টি গাড়ি বা ৬ হাজার ৬৬৪টি বোতল এলপিজি সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।

এছাড়া সিলেটের কৈলাসটিলায় অবস্থিত আরেকটি বটলিং প্ল্যান্ট চালু হয়েছে, যেখানে বছরে ৫ হাজার টন এলপিজি বটলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে।

বিপিসির সীমিত সক্ষমতার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলো এলপিজির বাজারে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। বটলিং প্ল্যান্ট, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সমন্বয়ে তৈরি এই সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে গত ১৫ দিনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, বটলিং প্ল্যান্ট, পরিবেশক ও খুচরা দোকানিদের গুদামে প্রচুর এলপিজি মজুত রয়েছে। এসব মজুতদারের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা হলেও বাজারে এই দামে পাওয়া যাচ্ছে না। ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা। একটি পরিবারে মাসে গড়ে ২-৩টি সিলিন্ডার প্রয়োজন হওয়ায় ভাড়া বাসায় বসবাসকারী ও সীমিত আয়ের মানুষ চরম আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন।

এলপিজি বিপণন কোম্পানি সূত্র জানায়, দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। মাসিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। দেশে মোট ৫৬টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও এর মধ্যে প্রায় ২৮টি কোম্পানি সক্রিয়ভাবে বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছে। এর মধ্যে ২০টি কোম্পানি সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে এবং বাকি কোম্পানিগুলো আমদানিকারকদের কাছ থেকে কিনে নিজস্ব বটলিং প্ল্যান্টে বাজারজাত করে।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top