শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২

ওকালতি ছেড়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হলেন জুয়েল রানা

লাইফস্টাইল ডেস্ক | প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:০৯

সংগৃহীত

কৃষি ও প্রকৃতিকে উপজীব্য করে, মানুষের জীবনবোধ আর সাহিত্যের ছোঁয়ায় ভিডিও বানান জুয়েল রানা। আধুনিক কনটেন্টের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর কাজ যেন এক নিঃশ্বাস ফেলা গ্রামবাংলা। গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা ফেসবুক পেজ ‘চিত্ত মিডিয়া’–এর ফলোয়ার এখন ৩৫ লাখের বেশি। কোনো কোনো ভিডিওর ভিউ ছুঁয়েছে ২ থেকে ৩ কোটি।

মাস তিন আগে ফেসবুকে হঠাৎই চোখে পড়ে একটি ভিডিও। আধুনিক যুগেও গরু দিয়ে হালচাষ করছেন এক বয়সী কৃষক। পাশে দাঁড়িয়ে শার্ট-প্যান্ট পরা এক মানুষ—নির্ভেজাল কৌতূহলে জানতে চাইছেন কৃষকজীবনের সুখ-দুঃখ। কখন যে ভিডিওটিতে ‘লাইক’ পড়ে গেছে, টের পাওয়া যায় না। সেই মানুষটিই ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর জুয়েল রানা।

এরপর একের পর এক ভিডিও ভেসে আসে নিউজফিডে। কৃষি, প্রকৃতি আর মানুষের জীবনদর্শনের অপূর্ব মেলবন্ধনে দর্শক মুগ্ধ হন বারবার। এখন পর্যন্ত তাঁর পেজে ভিডিও সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩৫০। প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে ভিডিও আপলোড করেন তিনি।

জুয়েল রানার ভিডিও মানেই ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’—এমন সব দৃশ্য। কোথাও মাছের ঘেরের ওপর বাঁশের কুঁড়েঘরে গোধূলিবেলায় ডানা শুকাচ্ছে পানকৌড়ির ঝাঁক, পাশে দাঁড়িয়ে এক সাদা বক। সেই দৃশ্যকে পেছনে রেখে তিনি আবৃত্তি করেন আল মাহমুদের ‘পানকৌড়ির রক্ত’সহ বাংলা সাহিত্যের কবিতা ও গল্প। আবার কোথাও ঝড়ে হেলে পড়া একটি খেজুরগাছ—যেটি এখনো প্রাণপণে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, ফোঁটা ফোঁটা মিষ্টি রস দিচ্ছে। সেই গাছকে ঘিরে তাঁর বার্তা,

“টিকে থাকার ইচ্ছাটা আগে নিজের থাকতে হবে।”

২০১৮ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন জুয়েল রানা। এরপর কয়েক বছর ওকালতির চেষ্টা করলেও মনে শান্তি পাননি। কৃষক বাবা চেয়েছিলেন ছেলে প্রতিষ্ঠিত হোক, চাকরি করুক। কিন্তু জুয়েলের মনে প্রশ্ন জাগে—জীবনের আসল তৃপ্তি কোথায়?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয় ‘চিত্ত মিডিয়া’। জন্মের এক বছরের মধ্যেই এই প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে লাখো মানুষের আবেগের ঠিকানা। ইউটিউবেও তাঁর সাবস্ক্রাইবার প্রায় এক লাখ।

কৃষক পরিবারে জন্ম হওয়ায় শৈশব থেকেই ফসল, ঋতু আর প্রকৃতির সঙ্গে জুয়েলের সখ্য। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর ভিডিওর মূল শক্তি। জুয়েলের ভাষায়,

“কৃষকের গল্প, সমস্যা আর ঋতুবৈচিত্র্য তুলে ধরলে কৃষি হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত শিল্প।”

ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গাসহ আশপাশের জনপদ ঘুরে ঘুরে ভিডিও বানান তিনি। তাঁর সঙ্গে কাজ করেন ইকরামুল কবির ও হাসানুজ্জামান। প্রকৃতির নিজস্ব শব্দ—ঘুঘুর ডাক, শেয়ালের হাঁক—ধরতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন মাঠে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গ্রামের মানুষের আস্থা অর্জন। ক্যামেরার সামনে কথা বলতে তাঁরা ভয় পান। সেই ভয় কাটিয়ে তাঁদের জীবনের সৌন্দর্য তুলে আনাই জুয়েলের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।

দর্শকের কেউ যখন বলেন, তাঁর ভিডিও দেখে শৈশবের গ্রামীণ জীবন মনে পড়ে—তখনই নিজেকে সার্থক মনে করেন জুয়েল রানা। তিনি বিশ্বাস করেন,

“সবাই যদি চাকরি করে, তাহলে পৃথিবীর রূপ-রসের গল্প বলবে কে? এর জন্য তো দু-একটা পাগল থাকা চাই!”

স্ত্রী নিশা ও তিন বছরের কন্যা জেসিকে নিয়ে ঝিনাইদহ শহরে তাঁর সংসার। বাবা-মা ও এক বোন থাকেন গ্রামের বাড়িতে।

গ্রামীণ জীবন, কৃষকের গল্প আর প্রকৃতির ভাষা মিলিয়ে জুয়েল রানা গড়ে তুলছেন এমন এক প্ল্যাটফর্ম—যেখানে মানবিকতা, শিক্ষা ও বিনোদন একসঙ্গে পথ চলে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নতুন করে অনুভব করানোর এক নীরব প্রয়াস তাঁর কাজ।

 

এনএফ৭১/ওতু



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top