ভুলের টাকা গিলে খাচ্ছে মেট্রোরেল: ঠকছেন যাত্রীরা
ভুলের টাকা গিলে খাচ্ছে মেট্রোরেল
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৫৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তরা যেতে মেট্রোরেলের একক যাত্রার টিকিট সংগ্রহ করেন সারোয়ার আলম। তবে ফার্মগেট পার হতেই উত্তরা যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় তাঁর। আগারগাঁও স্টেশনে নেমে যাত্রা শেষ করেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—৯০ টাকায় কেনা টিকিটের অর্ধেকের বেশি পথ বাকি থাকলেও সেই অংশের টাকা কি ফেরত পাওয়া সম্ভব?
স্টেশন প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে নেমে টিকিট বুথের দায়িত্বরত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললেও আশার কথা শোনেননি সারোয়ার। কর্মকর্তার ভাষ্য, “এমন পরিস্থিতিতে টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা মেট্রোরেলের সিস্টেমে নেই। পুরো যাত্রা শেষ করুন, নইলে টিকিট জমা দিয়েই চলে যেতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের ভাড়া ৩০ টাকা। অথচ ৯০ টাকার টিকিটের বাকি ৬০ টাকা ফেরত পাননি সারোয়ার। এটি গত মঙ্গলবারের ঘটনা। তবে এমন অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর নয়—প্রতিদিনই কোনো না কোনো যাত্রী একই সমস্যার মুখে পড়ছেন।
কয়েক দিন আগে একই পরিস্থিতির শিকার হন জামাল হোসেন। এক স্টেশন যাওয়ার পর জরুরি কাজে ট্রেন থেকে নেমে যেতে হয় তাঁকে। কিন্তু তিনিও টিকিটের বাকি টাকা ফেরত পাননি। স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাঁকেও জানান, নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানো না হলেও অতিরিক্ত ভাড়া ফেরতের সুযোগ নেই।
সাধারণত দূরপাল্লার বাস বা আন্তঃজেলা ট্রেনে যাত্রা অসম্পূর্ণ থাকলেও ভাড়ার টাকা ফেরত দেওয়া হয় না। তবে ঢাকার লোকাল বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনে নির্ধারিত গন্তব্যের আগে যাত্রা শেষ করলে ভাড়ার বাকি টাকা ফেরত পাওয়ার নজির রয়েছে। সেই বাস্তবতায় ঢাকার গণপরিবহন হয়েও মেট্রোরেলের ভাড়া নীতিতে যাত্রীবান্ধবতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুলে বেশি দূরত্বের টিকিট কাটা কিংবা পরিকল্পনা বদলে কম দূরত্বে নেমে পড়লে যাত্রীদের দেওয়া অতিরিক্ত টাকা ফেরত না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, তাঁদের ভুলের টাকা কার্যত ‘গিলে খাচ্ছে’ মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায়) প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন বলেন, “নির্ধারিত গন্তব্যের অতিরিক্ত যাত্রার জন্য যদি বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়, তাহলে কম যাত্রার ক্ষেত্রে টাকা ফেরত দেওয়া হবে না কেন? টাকা ফেরতের ব্যবস্থা থাকা উচিত।” তিনি বিষয়টি নিয়ে মেট্রোর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান।
বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করছে মেট্রোরেল। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে দৈনিক গড়ে প্রায় চার লাখ যাত্রী যাতায়াত করছেন। এতে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭৩ কোটি ২ লাখ টাকা, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪৬ কোটি ৬১ লাখ টাকায়।
ডিএমটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বছরে যাত্রী ভাড়া থেকে আয় হয় ২৪৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং পরের বছরে ৪০৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। তবে একক যাত্রার টিকিট ব্যবহারকারী যাত্রীর সংখ্যা কিংবা কতজন যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত চান—এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই সংস্থাটির কাছে।
ডিএমটিসিএলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “সরকার চাইলে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা চালু করা কঠিন কিছু নয়। প্রতিটি স্টেশনে যে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বুথ রয়েছে, সেখান থেকেই এই সেবা দেওয়া সম্ভব। স্মার্ট কার্ডে যাত্রার তথ্য সংরক্ষিত থাকে। সেগুলো যাচাই করেই টাকা ফেরত দেওয়া যায়। তবে এর জন্য সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।”
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “টাকা নেওয়া সহজ হলেও ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। এর স্থায়ী সমাধান হলো গণহারে এমআরটি পাস বিতরণ। বিনামূল্যে দিলেও বড় কোনো ক্ষতি হবে না। এতে যাত্রী বাড়বে, আয়ও বাড়বে, পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তিও কমবে।”
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।