চায়ের দোকানের আড্ডায় ঢাকা–১৪: ভোট ভাগের অঙ্কে কে এগিয়ে?
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭:৪৪
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দারুস সালামের রেডিও কলোনির পুরনো চায়ের দোকানটায় চুলা জ্বলছে টানা। রোদের তাপে ফুটপাথ গরম, আর দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা মানুষগুলোর আগ্রহ আরও চরমে। কেউ রিকশা রেখে বসেছে, কেউ কাজে যাওয়ার আগে শেষ চুমুক দিচ্ছে।
আলাপের বিষয় ঘুরেফিরে একটাই—ঢাকা–১৪ আসনের নির্বাচন। কে জিতবে, কে হারবে, আর কার ভোট কার ঘরে যাবে—এই হিসাব চলছে কোনো কাগজ-কলম ছাড়াই। এখানে নেই কোনো দলীয় ব্যানার, নেই স্লোগান। আছে কেবল অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি অনুমান।
কেউ বলছেন, বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে যাবে। কেউ বলছেন, জামায়াত নীরবে কিন্তু সংগঠিতভাবে এগিয়ে আছে। এই চায়ের দোকানেই যেন ধরা পড়ে ঢাকা–১৪ আসনের ভেতরের রাজনীতি।
আলোচনায় যোগ দেন চায়ের দোকানদার মজনু মিঞা (ছদ্মনাম)। তার ভাষায়, আগের মতো নির্বাচনি হইচই নেই ঠিকই, কিন্তু মানুষের ভোট নিয়ে আগ্রহ কমেনি। “পোস্টার-ফেস্টুন কম, মিছিলও চোখে পড়ে না। কিন্তু প্রার্থীরা ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। মাজার রোড, নদীর ওপার, মিরপুর–১ আর মিরপুর–২ এলাকায় তাদের দৌড়ঝাঁপ বেশি,” বলেন তিনি।
এই এলাকাগুলোতেই ভোটের হিসাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রেডিও কলোনির বাসিন্দা আবুল কাশেম নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তার মতে, জামায়াতের প্রার্থীর বড় শক্তি তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ। হাসপাতালসহ নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা অনেক ভোটারের কাছে ব্যক্তিগত সুবিধার প্রশ্ন তৈরি করছে।
অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থী স্থানীয় নন, আর স্বতন্ত্র প্রার্থী এলাকায় পরিচিত মুখ। ফলে বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। পাশের বেঞ্চ থেকে এক ভোটার মন্তব্য করেন, “স্বতন্ত্র কিছু ভোট নেবেন, ধানের শীষের কারণে তুলি কিছু ভোট পাবেন, আর মাঝখান দিয়ে দাঁড়িপাল্লা এগিয়ে যেতে পারে। জামায়াতের সংগঠন এখানে শক্ত।”
ঢাকা–১৪ শুধু একটি সংসদীয় আসন নয়। দারুস সালাম, আদাবর ও মোহাম্মদপুরের একাংশ নিয়ে গঠিত এই এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ কলোনি আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি।
এখানে রাজনীতি দেখা হয় দলীয় আবেগের চেয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রার্থীর জীবনগল্প ও মানুষের সঙ্গে তার সংযোগ দিয়ে। তাই প্রার্থীর পরিচয় অনেক সময় দলীয় পরিচয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়
এবারের নির্বাচনে সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট। এক পাশে আছেন ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হলেও তার পরিচয় একটি দলের গণ্ডিতে আটকে নেই। দীর্ঘদিন গুম হয়ে নিখোঁজ থাকার পর ফিরে আসা এই ব্যারিস্টারের জীবনগল্প ইতোমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে আলাদা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনেক ভোটারের চোখে তিনি প্রচলিত রাজনীতিক নন; বরং ফ্যাসিস্ট আমলের অন্যায়ের একজন প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী, যিনি সেই অভিজ্ঞতা থেকেই রাজনীতিতে এসেছেন।
অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলি। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের পেছনেও রয়েছে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। তার ভাই গুমের শিকার—যিনি আজও ফেরেননি। কর্মী-সমর্থকদের মতে, এই অভিজ্ঞতাই তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় করেছে। তাই তার প্রচারণায় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই দুই প্রার্থীর মাঝখানে আছেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক সাজু—দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি।
এলাকায় পরিচিত মুখ হওয়ায় তার একটি নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। অনেকের ধারণা, তিনি মূলত বিএনপির ভোটই কাটবেন, যার সুফল পেতে পারে জামায়াতের প্রার্থী।
সরেজমিনে কথা বলে বোঝা যায়, বড় একটি ভোটার গোষ্ঠী এখনো সিদ্ধান্তহীন। কেউ ব্যারিস্টার আরমানের ব্যক্তিগত সংগ্রামে প্রভাবিত, কেউ তুলির পারিবারিক বেদনায় আবেগী। আবার অনেকেই সরাসরি বলছেন—ভোট ভাগ হলেই ফলাফল অপ্রত্যাশিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে জয় নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তের ভোটার উপস্থিতি ও ভোট ভাগের অঙ্কের ওপর। সহানুভূতির ঢেউ কোন দিকে বেশি ঝুঁকবে, সেটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ঢাকা–১৪-এর ভাগ্য।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।