প্রকট গ্যাস ও এলপিজি সংকটে নাভিশ্বাস, সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা
স্টাফ রিপোর্টার । ঢাকা | প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২২
চলতি মাসের শুরু থেকে দেশে শুরু হওয়া তীব্র গ্যাস সংকট শিগগির কাটছে না। বরং দিন দিন চাহিদা বাড়ায় সামনে পরিস্থিতি আরও প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরবরাহ কমে যাওয়া ও কারিগরি ত্রুটির কারণে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। পাশাপাশি এলপিজির সরবরাহ সংকটে বাজারে তৈরি হয়েছে নৈরাজ্য। সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন গ্রাহকরা।
বাসাবাড়ির পাশাপাশি পরিবহন খাতেও মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলেছে এলপিজি সংকট। অনেক বাসাবাড়িতে রান্না করা সম্ভব না হওয়ায় হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন বাসিন্দারা। এ অবস্থায় পরিবহন খাতে এলপিজির সংকট নিরসনে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
গ্যাস সংকটের পেছনের কারণ
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২০ সালের পর থেকেই দেশে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে গেলেও নতুন কোনো বড় উত্তোলনযোগ্য রিজার্ভ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। সংকট মোকাবিলায় বর্তমানে এলএনজি আমদানিই একমাত্র ভরসা।
এ ছাড়া শীতকালে ঠান্ডার কারণে পাইপলাইনের ভেতরে জলীয় বাষ্প ও তরল পদার্থ জমে গ্যাসের চাপ কমে যায়। একই সময়ে বাসাবাড়িতে পানি গরম করার কারণে গ্যাসের চাহিদা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
২০১০ সাল থেকে আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় এলপি গ্যাসের গ্রাহক কয়েকগুণ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী ১৫ জানুয়ারির আগে এলপিজি সংকট কাটার সম্ভাবনা নেই।
পেট্রোবাংলার বক্তব্য
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন,
“সংকট কাটাতে নতুন নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে দুটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে আমদানির মাধ্যমে ভবিষ্যতে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলা করা যায়।”
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে গ্যাসের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে আমদানি করা এলএনজিসহ সরবরাহ রয়েছে মাত্র আড়াই থেকে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দৈনিক সংকট দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ থেকে দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট।
নগরজুড়ে ভোগান্তি
গেল ডিসেম্বর থেকেই বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে। চলতি মাসে তা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাত ১টার পর কিছুটা চাপ বাড়লেও ভোর হতেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ভূতের গলি ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ট্রিটের বাসিন্দা কামরুল শিকদার বলেন,
“গত ১৫ দিন ধরে বাসার সব খাবার হোটেল থেকে কিনে খাচ্ছি। গ্যাসের বিল ঠিকই নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু গ্যাস পাচ্ছি না। এতে সংসারের খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।”
একই ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মুগদা, বাড্ডা, শনিরআখড়া, রামপুরা, শান্তিবাগ, গুলবাগ, পুরান ঢাকার নবাবগঞ্জ, খিলগাঁও, শাজাহানপুর, জুরাইন, কেরানীগঞ্জ, সায়েদাবাদ, গ্রিন রোড, মহাখালী, আদাবর, মৌচাক, নাজিরাবাজার, নয়াবাজার, ধলপুর, মগবাজার, কল্যাণপুর ও মিরপুর এলাকার গ্রাহকরা।
এলপিজির বাজারে নৈরাজ্য
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার বিপরীতে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়।
পান্থপথের খুচরা ব্যবসায়ী আহাদ মুনির বলেন,
“মাল কম থাকায় এবং বেশি দামে কেনার কারণে দোকান প্রায়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বেশি দামে বিক্রি করলে অভিযান ও জরিমানার ভয় থাকে। যেখানে অভিযান দরকার, সেখানে সরকার নজর দিচ্ছে না।”
অটোগ্যাস স্টেশন বন্ধ
শনিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. সিরাজুল মাওলা বলেন,
“এলপিজি অটোগ্যাস পরিবেশবান্ধব ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি। সরকারের উৎসাহে দেশের ৬৪ জেলায় প্রায় এক হাজার অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এসব স্টেশনের ওপর নির্ভর করে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন এলপিজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তীব্র সংকটের কারণে প্রায় সব স্টেশন কার্যত বন্ধ।”
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সহসভাপতি সাঈদা আক্তার, সাধারণ সম্পাদক মো. হাসিন পারভেজসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পরিবহন খাতে প্রভাব
এলপিজির পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেও গ্যাস না পেয়ে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে যাত্রীসেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।