ঢাকাই সিনেমার ‘মহানায়ক’ মান্না
বিনোদন ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৮:০৮
বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় তিনি যখন তর্জনী উঁচিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিতেন, দর্শক অনুভব করতেন—এ যেন তাদেরই না-বলা ক্ষোভের ভাষা। প্রেমের গল্পে ছিলেন কোমল, আর অ্যাকশনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একাই একশ। কোটি ভক্তের হৃদয়ে তিনি ‘মান্না ভাই’; জন্মনাম এস এম আসলাম তালুকদার।

২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তার অকাল প্রয়াণের পর দেড় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা গ্রামের সেই চঞ্চল কিশোর কীভাবে হয়ে উঠলেন ঢাকাই সিনেমার এক অবিনাশী নক্ষত্র—সেই গল্পই ফিরে দেখা।
এলেঙ্গা থেকে এফডিসি
১৯৬৪ সালের ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া মান্নার শৈশব কেটেছে গ্রামীণ আবহে। মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় এসে ভর্তি হন ঢাকা কলেজ-এ। তবে রাজনীতি বা আড্ডার চেয়ে তাকে বেশি টানত চলচ্চিত্রের জগৎ। কিংবদন্তি নায়ক রাজ্জাক ছিলেন তার অনুপ্রেরণা।
১৯৮৪ সালে এফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমে নির্বাচিত হয়ে শুরু হয় তার অভিনয়যাত্রা। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘পাগলী’ ও ‘নিষ্পাপ’-এর মতো ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও দ্রুতই নিজস্ব উপস্থিতি জানান দেন।

সাফল্যের উত্থান ও ‘মান্না যুগ’
১৯৯১ সালে একক নায়ক হিসেবে ‘কাসেম মালার প্রেম’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পরিসরে আত্মপ্রকাশ। এরপর নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে, বিশেষ করে সালমান শাহ-এর অকালমৃত্যুর পর, ঢাকাই চলচ্চিত্রের হাল ধরেন মান্না।
পরিচালক কাজী হায়াত-এর ‘দাঙ্গা’, ‘ত্রাস’ ও ‘তেজী’ ছবিগুলো তাকে প্রতিষ্ঠিত করে অ্যাকশন হিরো হিসেবে। তার স্বতন্ত্র সংলাপ, ঘাড় দুলিয়ে হাঁটা এবং আগুনঝরা উপস্থিতি হয়ে ওঠে ট্রেডমার্ক। রিকশাচালক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী—সব শ্রেণির দর্শকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘নিজেদের মানুষ’।
‘আম্মাজান’: আবেগের বিস্ফোরণ
১৯৯৯ সালে পরিচালক মালেক আফসারী-এর ‘আম্মাজান’ মুক্তির পর মান্নার জনপ্রিয়তা ছুঁয়ে ফেলে নতুন উচ্চতা। মাতৃভক্ত সন্তানের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে। “আম্মাজান, চোখের মনি আম্মাজান”—গানটি আজও স্মৃতির ভাঁজে অমলিন। ব্যবসায়িক সাফল্যে ছবিটি হয়ে ওঠে সময়ের মাইলফলক, আর মান্না প্রতিষ্ঠা পান অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক হিসেবে।

শিল্পের কাণ্ডারি মান্না
১৯৯৭ সালে তিনি গড়ে তোলেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র। এখান থেকে নির্মিত হয় ‘লুটতরাজ’, ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’, ‘আব্বাজান’-এর মতো জনপ্রিয় সিনেমা।
শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল—পরিবার নিয়ে দেখার মতো সিনেমাই শিল্পকে টিকিয়ে রাখবে। এফডিসিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে তার ভূমিকা আজও আলোচিত।
আকস্মিক বিদায় ও বিচারপ্রক্রিয়া
২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন মান্না। পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসা-অবহেলার অভিযোগ তোলা হয় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতাল-এর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে মামলা হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে আছে—যা ভক্তদের মধ্যে আক্ষেপের কারণ হয়ে রয়েছে।
অমলিন উত্তরাধিকার
মৃত্যুর পরও মুক্তি পায় তার কয়েকটি চলচ্চিত্র, যেমন ‘পিতা মাতার আমানত’ ও ‘জীবন নিয়ে যুদ্ধ’। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে তার অসমাপ্ত কাজ ‘জীবন যন্ত্রণা’।
টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় তার কবরের পাশে দাঁড়ালে আজও শোনা যায় ভক্তদের দীর্ঘশ্বাস। মান্না প্রমাণ করে গেছেন—নায়ক হওয়ার জন্য কেবল চেহারা নয়, দরকার অভিনয়ের শক্তি আর মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তাই তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন; তিনি গণমানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী এক মহানায়ক।
এনএফ৭১/ওতু
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।