বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রপন্থার উত্থান
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন নিয়ে সরকারের দাতভাঙ্গা জবাব
রাজীব রায়হান | প্রকাশিত: ২ এপ্রিল ২০২৫, ১৩:৩৭

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসে নতুন বাংলাদেশ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যখন তার গণতন্ত্র পুনর্গঠন এবং দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের জন্য একটি নতুন ভবিষ্যৎ তৈরির চেষ্টা করছে, তখন দেশের ধর্মনিরপেক্ষ মুখোশের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা ইসলামী চরমপন্থার ধারাটি ফুটে উঠছে। নারীর শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ব্যাপারটি শুরু করে ইসলামী উগ্রপন্থীরা।
মঙ্গলবার অনলাইনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। তবে এই প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টসের ফেসবুক পেজে বলা হয়, একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি ও ভুল চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও একপক্ষীয় ধারণা তৈরি করছে।
মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে এক পোস্টে নিবন্ধটির বিষয়ে এমন মত দেন। শফিকুল আলম বলেন, নিবন্ধটি বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি বিভ্রান্তিকর ও একপক্ষীয় ধারণা তৈরি করছে, যেখানে দেশটিকে ধর্মীয় চরমপন্থার করাল গ্রাসে পতিত হতে চলেছে বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বর্ণনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতাকে অতিসরলীকৃতভাবে দেখছে এবং ১৮ কোটি মানুষের সমগ্র জাতিকে অন্যায়ভাবে কলঙ্কিত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং বাস্তব পরিস্থিতির জটিলতাকে স্বীকার করা হোক, শুধু বাছাইকৃত কিছু ঘটনা তুলে ধরে ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানোর পরিবর্তে।
তিনি বলেন, নিবন্ধটিতে কিছু ধর্মীয় উত্তেজনার ঘটনার বিপরীতে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সমাজের অগ্রগতির দিকটি উপেক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ নারীদের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষভাবে তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নারী অধিকার ও সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এই সরকারকে যে চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
তিনি ‘যুব উৎসব ২০২৫’-এর উদাহরণ টেনে বলেন, যেখানে দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে প্রায় ২৭ লাখ মেয়ে অংশ নিয়েছে এবং ৩ হাজারটি খেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে। এই বিশাল অংশগ্রহণ-যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আদিবাসী তরুণী ও বিভিন্ন স্তরের নারীরা যুক্ত হয়েছেন-বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাণবন্ততা প্রমাণ করে। একটিমাত্র ফুটবল খেলা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া মানে এই নয় যে বাকি ২ হাজার ৯৯৯টি সফল আয়োজনের মূল্য নেই। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক অগ্রগতিকে খাটো করে দেখানো প্রকৃত সত্যকে আড়াল করা।
নিবন্ধে ‘প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস চরমপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেননি’- এমন দাবি প্রসঙ্গে শফিকুল আলম বলেন, এটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর এবং তার দীর্ঘদিনের নারীর ক্ষমতায়নের কাজকে অস্বীকার করে। ইউনূস সব সময় নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। গ্রামীণ ব্যাংক ও তাঁর ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য কাজ করেছেন, যা তাঁকে নোবেল পুরস্কার এনে দিয়েছে। তিনি নারী অধিকারের প্রতি আজীবন অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন এবং সেটিই তাঁর কাজের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে চিত্রিত করা বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, শেখ হাসিনার বিদায়ের পর যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা মূলত রাজনৈতিক এবং এর অনেকগুলো ঘটনাকে ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই জনসমর্থন পেতে ধর্মকে ব্যবহার করে, যা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ধর্মীয় নিপীড়ন বলে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, এই লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ যে সামাজিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তা ভুল তথ্য ছড়িয়ে ঢেকে ফেলা উচিত নয়।
বাংলাদেশ এখন এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, বিগত কয়েক মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও ব্যাংকিং খাত অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা বাজার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। শুধু গত সপ্তাহে, তার চীন সফরের সময় বাংলাদেশ ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, আগামী সপ্তাহে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘ইনভেস্টরস কনফারেন্স’, যেখানে ৫০টি দেশের ২ হাজার ৩০০ প্রতিনিধি, মেটা, উবার, স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। এই অগ্রগতি কি ধর্মীয় উগ্রবাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোনো রাষ্ট্রের চিত্র হতে পারে? দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এই আশাব্যঞ্জক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে ভুলভাবে চিত্রিত করছে।
নিবন্ধে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা তুলে ধরে ১৮ কোটি মানুষের একটি জাতির পরিচয় গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে-যা নৈতিকভাবে অনুচিত উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময়, গতিশীল ও সংস্কৃতির দিক থেকে সমৃদ্ধ দেশ। ধর্মীয় উগ্রবাদ শুধু বাংলাদেশে নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশ আইন প্রয়োগ, সামাজিক সংস্কার ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমের মাধ্যমে এর মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই জাতি সংখ্যালঘু, নারী ও যুবসমাজের সুরক্ষার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বক্তব্য ও কার্যকলাপকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নীতি ও ভবিষ্যতের পরিচায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর উগ্রপন্থার উত্থানকে অনিবার্য ধরে নেওয়া একেবারেই ভুল ধারণা। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক চেতনা, শক্তিশালী নাগরিক সমাজ ও যুবসমাজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সূত্র: সময়ের আলো, সমকাল
বিষয়:
পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।