জ্বালানিতে নির্ভরতার ফাঁদে বাংলাদেশ, সমাধান কি সামনে?
মিঠু মুরাদ | প্রকাশিত: ৩১ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৫
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর। বৈশ্বিক রাজনীতির একেকটি ঝাঁকুনি সরাসরি প্রভাব ফেলে দেশের অর্থনীতি, শিল্প, এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল নিয়ে যে আতঙ্ক, তা শুধু একটি সাময়িক সংকট নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর এ তথ্যই যথেষ্ট বোঝাতে, আমরা কতটা ঝুঁকির মধ্যে বাস করছি। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা এবং সেই তেল পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালির মতো অনিশ্চিত রুটের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের অবস্থানকে আরও নাজুক করে তুলেছে। আজ যুদ্ধ, কাল অবরোধ এই বাস্তবতায় একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কখনোই স্থিতিশীল থাকতে পারে না।
বর্তমান মজুদ কয়েক সপ্তাহের জন্য স্বস্তি দিলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং আতঙ্কজনিত কেনাকাটা ও মজুদ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। এই প্রবণতা শুধু বাজারে চাপ বাড়ায় না, বরং প্রকৃত সংকটের আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। তাই জনসচেতনতা বাড়ানো এবং কঠোর বাজার তদারকি এখন জরুরি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আমরা কি এখনো সময় থাকতে পথ পরিবর্তন করব? জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি বাধ্যবাধকতা। বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি কিছুটা ঝুঁকি কমালেও, মূল সমস্যা রয়ে গেছে আমদানিনির্ভরতা। তাই দীর্ঘমেয়াদে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে বিকল্প জ্বালানির দিকে।
বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তি হতে পারে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ ইতিমধ্যে কিছুটা সাফল্য দেখিয়েছে। এই উদ্যোগকে বড় পরিসরে নিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপচয় রোধেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এছাড়া কৌশলগত মজুদ বাড়ানো সময়ের দাবি। উন্নত দেশগুলো মাসের পর মাস জ্বালানি মজুদ রাখে, আর আমরা মাত্র কয়েক সপ্তাহের ওপর নির্ভর করি এ বাস্তবতা পরিবর্তন করা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি, বিকল্প রুট এবং নতুন সরবরাহকারী খোঁজাও এখন নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান সংকট একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হলেও, একই সঙ্গে সুযোগও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ। যদি এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তাহলে প্রতিটি বৈশ্বিক সংকটই আমাদের জন্য হয়ে উঠবে একেকটি দুর্যোগ। বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে শুধু জ্বালানি আমদানি নয়, জ্বালানি স্বাধীনতার দিকেও এগোতে হবে—এটাই সময়ের দাবি।
মিঠু মুরাদ
সহ-সম্পাদক, নিউজফ্ল্যাশ ৭১
[নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজফ্ল্যাশ ৭১ মুক্তমত নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, নিউজফ্ল্যাশ ৭১ কর্তৃপক্ষের নয়।]
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।