এলপিজি সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের পেছনের কারণ
ড. এম শামসুল আলম | প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৬
কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের পেছনের কারণ কি? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর জন্য মূলত সরকারই দায়ী।
১৯৮০ সাল থেকে দেশে জ্বালানি খাতের কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। সরকারি কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অদক্ষ হয়ে পড়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মুনাফা ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। পাশাপাশি, বেসরকারীকরণ ও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে খাত উন্নয়ন করা হলেও এটি কোনো নীতি হিসেবে কার্যকর হয়নি। উন্নত দেশগুলো রাষ্ট্রের সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে এ খাতে সাফল্য অর্জন করেছে।
সরকার ২০০৩ সালে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গঠন করে, যা ২০০৮ সালে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১১-১২ সালে ‘প্রতিযোগিতা কমিশন’ এবং ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ ছিল ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা।
তবে পরবর্তীতে জ্বালানি খাত অবহেলার শিকার হয়। দুর্নীতি ও অনিয়ম বেড়ে যায় এবং কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বৃদ্ধি করতে থাকে। হাইকোর্টের মামলা ও গণশুনানির পরেও বিইআরসি কার্যক্রম থেকে সরে যায়। কোম্পানিগুলো প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দরজা বন্ধ করে দাম নির্ধারণ করতে থাকে। ফলে আজকের জ্বালানি সংকটের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্র আর সক্ষম নয়। বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় মনোপলি ও ওলিগোপলি বিস্তৃত হয়েছে। সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে ভোক্তারা অসহায়।
প্রাক্তন ও বর্তমান সরকারের উভয় সময়েই গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। দেশের মানুষের তহবিল থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালে দেখা গেছে, গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বরাদ্দ ৬৫ শতাংশ তহবিল ব্যবহার হয়নি। এর ফলে দেশীয় উৎপাদন কমছে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও বিদেশি ফার্নেস অয়েল আমদানির মাধ্যমে অতিরিক্ত খরচ ও মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে স্থানীয় কয়লা ১৭৬ ডলারে তোলা হলেও আমদানির মাধ্যমে ১০০ ডলারে আনা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের কৌশল দেশের জ্বালানি খাতকে দুর্বল করেছে।
সম্প্রতি ক্যাবের যুব সংসদ ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এতে রয়েছে:
-
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি
-
বিশেষ বিধান আইন সংশ্লিষ্ট রিট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি
-
সকল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তি বাতিল
-
ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ
-
সরকারি সেবা মুনাফামুক্ত নিশ্চিত করা
-
জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি কমানো
-
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি
-
গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে দেশীয় কোম্পানি দ্বারা অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত
-
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার ও ‘জ্বালানি অপরাধী’ ঘোষণা
-
লাইসেন্স বাতিল ও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে নতুন লাইসেন্স প্রদান
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশের জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধান সম্ভব।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।