বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে হরিলুট, তদন্তে নেমেছে দুদক
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৮
সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ উন্নয়নের জন্য নেওয়া ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। একই কাজের জন্য দ্বৈত বিল উত্তোলন, তামার ক্যাবল ও লোহার সামগ্রীসহ সরকারি কোটি কোটি টাকার মালামাল গায়েব, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ঠিকাদার-প্রকৌশলী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় অনিয়ম ও ভুয়া বিল উত্তোলনের অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
জানা গেছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে ‘বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ’ নামে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ১১ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পরে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে শুরু থেকেই প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, বিভিন্ন উপকরণের দাম বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ৩৩ কেভি ওভারহেড লাইনের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় সর্বোচ্চ ৩৪ লাখ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পে তা প্রায় ৪২ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। একইভাবে সাবস্টেশন নির্মাণ, ট্রান্সফরমার স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যয়ও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার নতুন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার পুরোনো লাইন সংস্কার, ২২টি জিআইএস সাবস্টেশন স্থাপন ও সংস্কার, ১৭টি গ্রিড সাবস্টেশনের সম্প্রসারণ এবং প্রায় ৩ হাজার ৪৮৫টি বিতরণ স্টেশন স্থাপন ও সংস্কারের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে গোবিন্দগঞ্জ ট্রাফিক পয়েন্ট হয়ে রাউলী সাবস্টেশন পর্যন্ত ৩৩ কেভি লাইনের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। প্রকল্প অনুযায়ী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাত বছরেও তা শেষ হয়নি। প্রকল্পে ৩ হাজার ৬০০টি খুঁটি বসানোর কথা থাকলেও বাস্তবে বসানো হয়েছে মাত্র ৯০০টি। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে এখনও শত শত খুঁটি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ ক্যাবল, ট্রান্সফরমার ও লোহার সামগ্রী গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একই কাজের জন্য প্রকল্প থেকে বিল তোলার পাশাপাশি বিভাগ থেকেও আলাদা করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ হয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে রাউলী পর্যন্ত ৩৩ কেভি লাইনের কাজ প্রথমে দুলাল পাল নামে এক ঠিকাদার শুরু করেন। পরে নতুন করে ইস্টিমেট তৈরি করে প্রায় ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকার কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর টিআর এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজের দায়িত্ব পেলেও প্রতিষ্ঠানটির মালিক আজিজুর রহমান ২৪ লাখ টাকার বিনিময়ে কাজটি সানরাইজ ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেক প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে বিক্রি করে দেন। এতে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া নতুন লাইন ও ট্রান্সফরমার বসানোর নামে গ্রাহকদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ছাতক, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, দিরাই ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন লাইন বসাতে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ট্রান্সফরমার বসাতে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, এভাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকার বেশি ঘুষ আদায় করা হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আর্থিক লেনদেন, মালামালের হিসাব ও কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগের বিষয়ে বিউবো সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করে ব্যস্ততার কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) চন্দন কুমার সূত্রধর দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। তবে প্রকল্পে কোনো অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।