মানবদেহের গঠন ও কার্যক্রমের সম্পূর্ণ নকশা লুকিয়ে আছে ডিএনএতে। প্রায় ৩০০ কোটি রাসায়নিক অক্ষরের এই জটিল বিন্যাসই নির্ধারণ করে মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, সুস্থতা এবং বংশগত রোগের ঝুঁকি। এর মাত্র ২ শতাংশ অংশ পরিচিত জিন, যা সরাসরি প্রোটিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বাকি ৯৮ শতাংশ অংশকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘ডার্ক জিনোম’—যার রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
এই অজানা অংশের রহস্য ভেদে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) শরণাপন্ন হচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। গুগল ডিপমাইন্ড তৈরি করেছে নতুন এআই মডেল ‘আলফাজিনোম’, যা মানব ডিএনএর জটিল কোড বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয় ও নতুন ওষুধ আবিষ্কারে বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলফাজিনোম মানবদেহের জিনগত নকশা বিশ্লেষণ করে বুঝতে সাহায্য করবে—ডিএনএর সামান্য পরিবর্তন কীভাবে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা বা ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে জিনগত রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা গবেষণায় গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মানব জিনোমের মাত্র ২ শতাংশ অংশ প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা দেয়, কিন্তু বাকি ৯৮ শতাংশ অংশই নিয়ন্ত্রণ করে জিনের সক্রিয়তা, বিন্যাস এবং আচরণ। দীর্ঘদিন ধরেই এই ‘ডার্ক জিনোম’ বিজ্ঞানীদের কাছে এক রহস্য। অথচ অনেক জটিল রোগের মূল সূত্র লুকিয়ে আছে এই অংশেই।
আলফাজিনোম এই অজানা অংশ বিশ্লেষণ করে দেখাতে পারে—কোন জিন কখন সক্রিয় হবে, কোন পরিবর্তন ক্ষতিকর হতে পারে এবং কোন মিউটেশন রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গুগলের এই এআই মডেল একসঙ্গে প্রায় ১০ লাখ ডিএনএ অক্ষর বিশ্লেষণ করতে পারে। শুধু জিন শনাক্তই নয়, বরং জেনেটিক কোডের একটি মাত্র অক্ষর বদলালেও তার সম্ভাব্য প্রভাব আগেভাগেই অনুমান করতে সক্ষম আলফাজিনোম।
ডিপমাইন্ডের রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার নাতাশা লতিশেভা বলেন, “আমরা আলফাজিনোমকে প্রাণের সংকেত বোঝার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখছি। এটি বিরল জিনগত রোগ শনাক্ত এবং নতুন ওষুধের লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” ভবিষ্যতে কৃত্রিম জিনথেরাপি উন্নয়নেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে বলেও জানান তিনি।
ইংল্যান্ডের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. গ্যারেথ হকস ইতোমধ্যে এই মডেল ব্যবহার করে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের জিনগত কারণ বিশ্লেষণ করছেন। তার মতে, আলফাজিনোম এখনও পূর্ণাঙ্গ সমাধান না হলেও এটি জিন গবেষণায় এক বিশাল অগ্রগতি।
ক্যান্সার গবেষণাতেও আলফাজিনোম ব্যবহার করে দেখা হচ্ছে—কোন মিউটেশন টিউমার সৃষ্টি করে এবং কোনটি চিকিৎসার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বেন লেহনার জানান, প্রায় ৫ লাখ পরীক্ষায় মডেলটি ইতিবাচক ফল দিয়েছে। তবে এটি এখনও নিখুঁত নয় এবং আরও উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জিন গবেষণার এই সমন্বয় ভবিষ্যতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারের পথকে আরও সহজ করে তুলবে।
পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।