বৃহঃস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩

ফুয়েল কার্ড: নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নাকি ভোগান্তির নতুন নাম?

মিঠু মুরাদ | প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:২৮

গ্রাফিক্স নিউজ ফ্ল্যাশ৭১

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। ইরান, রাশিয়া-ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। এর ঢেউ এসে আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের বাজারেও। প্রতিদিনই জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা এবং সরবরাহ সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন চাপ তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি চক্র আগেভাগেই তেল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে—এমন অভিযোগও কম নয়। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রির ঘটনাও জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে “ফুয়েল কার্ড” চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। মূল উদ্দেশ্য ছিল—চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, অপচয় রোধ এবং সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এই উদ্যোগ যতটা আশার সঞ্চার করেছিল, তার চেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুয়েল স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি না পাওয়ার অভিযোগ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, আর ফুয়েল কার্ড যেন ধীরে ধীরে “গলার কাঁটা” হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও প্রকট। একজনের নামে নিবন্ধিত কার্ড থাকলেও, জরুরি মুহূর্তে অন্য কেউ গাড়ি ব্যবহার করলে তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। হঠাৎ রাস্তায় জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, একটি কার্ডনির্ভর ব্যবস্থা কতটা বাস্তবসম্মত, যখন ব্যবহারকারীর পরিস্থিতি সবসময় একরকম থাকে না?

অন্যদিকে, কার্ড ছাড়া তেল বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও, অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ পথে কিছু ব্যবসায়ী ঠিকই তেল বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বৈধ গ্রাহকরা যেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন, সেখানে অনিয়মকারীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এতে করে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফুয়েল কার্ড একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হলেও এর বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এবং তদারকির দুর্বলতা এই উদ্যোগকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

সুতরাং, ফুয়েল কার্ডের মূল উদ্দেশ্য, স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ সঠিক হলেও, এর প্রয়োগে আরও মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা, জরুরি পরিস্থিতির জন্য নমনীয়তা তৈরি করা এবং কঠোরভাবে অনিয়ম দমন, এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে, ফুয়েল কার্ড কখনোই জনবান্ধব উদ্যোগে পরিণত হবে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়, ফুয়েল কার্ড কি সত্যিই সমাধান, নাকি এটি কেবল নতুন এক ভোগান্তির নাম? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে এর কার্যকর ও বাস্তবসম্মত বাস্তবায়নের ওপর।

 

মিঠু মুরাদ 

সহ সম্পাদক নিউজ ফ্ল্যাশ ৭১

 

[নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজফ্ল্যাশ ৭১ মুক্তমত নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, নিউজফ্ল্যাশ ৭১ কর্তৃপক্ষের নয়।]



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top